ভারতজুড়ে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন চলছে। পৃথিবীর বৃহত্তম এ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে মূলত তিনটি নির্বাচনী রাজনৈতিক জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন কংগ্রেসপার্টির নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা (ইউপিএ), প্রধান বিরোধী দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা (এনডিএ) এবং এর বাইরে তৃতীয় শক্তি হিসেবে ১৪টি আঞ্চলিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ফেডারেল ফ্রন্ট ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক জনমত জরিপে ভারতের চলমান লোকসভা নির্বাচনে জয়-পরাজয় নিয়ে নানা পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ প্রতিনিয়ত তাদের জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ-উপস্থাপন করছেন। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস, ভারত চেতনা, ভারতীয় জনগণের প্রার্থী নির্বাচনের অগ্রাধিকারের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করলে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ভারতে এবারকার নির্বাচনে কংগ্রেস ও বিজেপি কেউই জিতবে না। ফেডারেল ফ্রন্টকে জনগণ পরীক্ষ করতে চাইলেও তাকে বিজয়ী করার বৃহত্তম ঝুঁকি ভারতীয়রা কখনো গ্রহণ করবে না। অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততা, বেকারত্ব সামাজিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ভারতের সমাজ ও রাষ্ট্রকে যেভাবে দীর্ণ-বিদীর্ণ করে দিচ্ছে, সেই প্রেক্ষিতে যারা সুস্পষ্ট বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি দিতে সক্ষম হবে, তারাই এ নির্বাচনে বিজয়ী হবে। মোদীর গুজরাট মডেল ভারতীয়দের কাছে ঈর্ষণীয় হলেও মমতার বাংলা মডেলও জনগুরুত্বপূর্ণ নয়। অপরদিকে কংগ্রেসের অহিংস নীতিতে পরিচালিত সর্ব-ধর্ম-বর্ণ-সাম্যের ভারতও বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু কংগ্রেস ভারত চেতনা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে, দুর্নীতিতে সেঞ্চুরী করেছে, ফলে ভারতীয়রা হয়ত বিজেপির অর্থনৈতিক অগ্রসরতায় প্রতিশ্রুতিকে পছন্দ করবে। জনমত জরিপসমূহ বিজেপি জোটের জয়ের পক্ষে যে পূর্বাভাস দিচ্ছে, তা মূলত বিজেপিকে নয়, বরং বিজেপির সুশাসনের প্রতিশ্রুতিকে সমর্থন করছে। অর্থাত্ ভারতের চলমান ষোড়শ নির্বাচনে বিজেপি ও কংগ্রেস কেউই জিতবে না। বরং অন্যান্য জাতীয় ও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো জনগণের দৃষ্টিতে উপস্থাপিত করে যারা প্রচারণা চালাবেন, তাদের সমর্থনেই ভারতের জনগণের রায় ঘোষিত হবে। অর্থাত্ সুশাসনের প্রতিশ্রুতিই জয়ের মূল নিয়ন্ত্রক হবে।
রাষ্ট্রীয় নীতি ও আদর্শের কারণে কংগ্রেসের বিজয় প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তিগুলো হলো:নজীরবিহীন দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, অর্থনীতির নিম্নগামিতা। ভারতের খুচরা বাজারে মূল্যস্ফীতির হার শতকরা ১০ ভাগ গত তিন বছরে ভারতীয়দের চরম অস্বস্তিতে নিক্ষেপ করেছে। বিশেষত খাদ্য-দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ব্যাপকভাবে কংগ্রেস বিরোধী জনমত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। গত এক দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে শতকরা ৫ ভাগে উপনীত হয়েছে। প্রবৃদ্ধির চাকা যেন ঘুরতেই চায়নি। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের অনেকের নজিরবিহীন দুর্নীতি মিডিয়া বলয় থেকে জনগণের তৃণমূল পর্যন্ত এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে যে, আন্না হাজারের মত ব্যক্তিদের দুর্বার আন্দোলনে জড়াতে হয়েছে। দুর্নীতি বিরোধী প্রচার চালিয়ে আম আদমী দিল্লীর মসনদে বসেছে। চাকরিচ্যুতি, কর্মসংস্থানের অভাব, বেকারত্বের অভিশাপ ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণঅসন্তোষ তৈরি করেছে।
অপরদিকে বিজেপির ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ ভারতীয় জনগণের অস্বস্তির উত্স হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অহিংস, অসহযোগের নীতিতে শাসিত ভারতের জনগণের মনোকাঠামোতে যে চেতনা গেঁথে আছে, তার সাথে বিজেপির কর্মকাণ্ড খাপ খায় না; ফলে আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস ও বিজেপির কেউই জনগণের ভোটের বিবেচনায় গুরুত্ব পাবে না এটাই স্বাভাবিক। তবুও তারা দুষ্টদের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠতর বিকল্পই গ্রহণ করতে চাইবে। এ ক্ষেত্রে চাকরির নিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের সহনশীলতা প্রভৃতি প্রশ্নে বিজেপির প্রচারিত নীতির প্রতি ঝুঁকে যেতে পারে। কিন্তু সেই প্রবণতা বিজেপিকে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেবে না, এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় নিঃসন্দেহে। সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপির অবস্থান উন্নততর হতে পারে। কিন্তু তা কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পরিণত হবে না। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের প্রয়োজনে বিজেপি ভারতের প্রান্তিক রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে কোয়ালিশন করতে বাধ্য হবে। অবশ্য কংগ্রেসও এমন বিকল্প বেছে নিতে পারলে হয়ত ফলাফল উল্টো হবে।
ভারতের মত বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনের জটিল প্রক্রিয়ায় জনমত জরিপ খুবই ভ্রমপ্রবণ হয়ে থাকে এবং ২০০৪ সালের নির্বাচনে মতামত জরিপ ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু এবারকার নির্বাচনের প্রাক মূল্যায়ন যে মোদীকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করেই ফেলেছে।
কে এই মোদী? রেললাইনের প্লাটফর্মে চা বিক্রি করে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে শীর্ষস্থান অর্জন করার যোগ্যতা সৃষ্টি করলেও তার রাজনৈতিক মতাদর্শ রচিত হয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদের মূলনীতির স্রোতধারায়। ৭ এপ্রিলে নির্বাচন শুরু হওয়ার মুহূর্তে বিজেপি প্রচারিত রাজনৈতিক ইশতেহারে বিজেপির দুটি মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে। (ক) উন্নয়ন (খ) হিন্দু স্বার্থরক্ষা। ৫২ পৃষ্ঠা সম্বলিত বিরাট রাজনৈতিক ইশতেহারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকতা উদগীরিত হয়েছে। এবারকার ইশতেহারে বিজেপি অযোধ্যায় ধ্বংসকৃত বাবরী মসজিদে রাম মন্দির নির্মাণের দাবি পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ১৯৯২ সালে বাবরী মসজিদ ধ্বংস করার পর অযোধ্যায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় প্রায় ২০০০ মুসলিম নিহতের বিস্মৃতিকে মূর্তভাবে জাগিয়ে তোলা হয়েছে বিজেপির ইশতেহারে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি চরম নির্যাতনমূলক নীতি ঘোষিত হয়েছে কুরবানীর ঈদে গরু জবাই নিষিদ্ধ করার ইশতেহারের মাধ্যমে।
উপরিউক্ত বিশ্লেষণ এবং জনমত জরিপ হতে বুঝা যায়, বিজেপি জোটের প্রার্থী নরেন্দ্র মোদী হয়ত ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে বিজেপির রাজনৈতিক মতাদর্শ তেমন প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয় না। আগেই উল্লেখ করেছি, ভারতীয়রা গান্ধীজীর অহিংস আদর্শে আপ্লুত, নেহরুর সর্ব-ধর্ম-বর্ণ-সৌহাদ্র্যের চেতনায় সিক্ত। নিঃসন্দেহে নরেন্দ্র মোদীর উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ভারতীয়দের কাছে প্রত্যাখ্যানযোগ্য। কিন্তু এর চেয়ে বড় অগ্রাধিকারের প্রশ্নগুলো সম্পূর্ণই পৃথক ও স্বতন্ত্র। সম্ভবত ঐসব জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকেই ভারতীয়রা এবার বিবেচনায় আনবে।
ইতোমধ্যে নরেন্দ্র মোদী গুজরাটকে ধন-রত্ব-সম্ভারেপূর্ণ একটি রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। ভারতীয়রা বেশ নিশ্চিত যে, মোদী লালফিতা ছিঁড়ে ব্যবসা-বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে সক্ষম। তার নির্বাচনী প্রচারণায় বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং শিল্প কারখানা স্থাপনের উপর গুরুত্ব দিয়ে মোদী ভারতীয়দের সাধারণ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অর্থাত্ অর্থনৈতিক বিবেচনাসমূহ ভারতীয়দের মোদীর পক্ষে ভোট দেয়ার কারণ তৈরি করেছে, তার রাজনৈতিক মতাদর্শ এ ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি করলেও ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে তেমন বাধার কারণ হয়ে ওঠেনি।
একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কে রাজনৈতিক অর্থনীতি অত্যন্ত তাত্পর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছ। এখন আর রাজনৈতিক মতাদর্শ, রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা যায় না। রাজনীতির উপর মানুষের অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো নানাভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে। ব্যবসা, বিনিয়োগ, চাকরি, শিক্ষা, সংস্কৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সুস্পষ্ট অবদানই কেবল ভোটের বিবেচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ সৌদী আরব, কাতার, কুয়েত প্রভৃতি আরব রাষ্ট্রগুলোর একনায়কত্ব টিকে থাকার পেছনে জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আর্থিক সচ্ছলতা অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কম্যুনিস্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের রোমাঞ্চ সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণকে খুব বেশি সময় আবেষ্টিত করতে পারেনি। অর্থনৈতিক অনগ্রসরতায় চরম পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়। অর্থনৈতিক মন্দা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকেও সাম্প্রতিক সময়ে অনেকবার চরম ঝাঁকুনি দেয়। এমনি আর্থ-সামাজিক বিষয়গুলোকে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে জনগণ বিচার করবে। কংগ্রেস জনগণের কাছ থেকে ছিটকে পড়বে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি অবহেলার কারণে।
অবশ্য এ ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় যে, আত্মশুদ্ধি অর্জন সক্ষম হলে ভারতীয়রা পুনরায় কংগ্রেসের দিকেই দৃষ্টি নিবন্ধ করবে এবং এতে তারা বেশি স্বাছন্দ্য বোধ করবে। ২০০৪ সালের নির্বাচনের পূর্ব কংগ্রেস বিরোধী প্রচারণা থাকলেও সকল মতামত জরিপ মিথ্যা প্রতিপন্ন করে কংগ্রেসই ২০০৪ সালের নির্বাচনে জিতেছিল। কংগ্রেসের এ জয় ছিল তার আদর্শের জয়, এ জয় ছিল জনগণকে তাদের প্রয়োজন পূরণের প্রতিশ্রুতির জয়। চলতি নির্বাচনে বিজেপির জয়ের ব্যাপারে যে পূর্বাভাস আসছে তা কখনোই বিজেপির রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নয়। বরং সে জয়ের মূল কারণ জনগণের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণে বিজেপির বাস্তববাদী প্রচারণা এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি। ভারতের জনগণ এখন ভাবছে পুরো ভারত হয়ত নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব গুজরাটের মত ঐশ্বর্যময় হয়ে উঠবে, ঘরে ঘরে খাবার জুটবে, জনে জনে চাকরি মিলবে। ব্যবসা বিনিয়োগকে আকর্ষণ করে, চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রবৃদ্ধির নিশ্চিত হার উপস্থাপন করে মোদী ভারতীয় জনগণের আস্থা কিছুটা অর্জন করেছেন। বর্তমান নির্বাচনে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে হয়ত তার অর্থনৈতিক অ্যাজেন্ডার কারণে সেই জয় নিশ্চিত হবে। কিন্তু শীঘ্রই কংগ্রেসের নীতি সংশোধনী ঘটলে আবারো কংগ্রেসকে জনগণ কাছে টানবে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন মোদীর ও বিজেপির রাজনৈতিক মতাদর্শের সংস্কার সাধন এবং ভারতের অহিংস চেতনার সাথে তার সাঞ্জস্য স্থাপন।
লেখক:অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
