বারেক কায়সার, জিয়াউর রহমান চৌধুরী, আনিস রহমান, শফিকুল ইসলাম সবুজ
কৃষক আবদুল করিমের চোখে-মুখে চিন্তার ভাঁজ। সোনালি ধানের মাঠে আজ নোনাপানির রাজত্ব। সাতজনের পরিবারের ভরণপোষণ মেটানো তাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে আবদুল করিমের কাছে। এভাবে চলতে থাকলে দক্ষিণাঞ্চলের চর আত্রার আবদুল করিমের মত দশা হবে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সব কৃষকের।
এ তো গেল দক্ষিণাঞ্চলের কথা। উত্তরের হাওয়াও খুব একটা সুবিধার নয়। ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির। এক সময়ের ব্যস্ত কৃষক রফিকের ক্ষেতের লক্ষণ ভালো নয়। সেচ প্রকল্পে পানি নেই। ক্ষেতের ধানগাছ শুকিয়ে মৃতপ্রায়। চলতি বোরো মৌসুমে আশাজনক ফলন মিলছে না তা নিশ্চিত রফিকের কপালে। উত্তরাঞ্চলের এমন চিত্র এখন হর-হামেশার।
নিজেদের প্রাণ টিকিয়ে রাখতে দেশ থেকে দেশান্তরে আজ পরিবেশ রক্ষার চেষ্টা চলছে। সেখানে বাংলাদেশ বোধহয় উলটো পথেই হাঁটছে। পুরো বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কাজ করে চলেছে সেখানে বাংলাদেশের চিত্রটা আসলেই মন খারাপ করার মতোই।
সুন্দরবনের কাছেই বনের ক্ষতি করে গড়ে তোলা হচ্ছে রামপাল তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্র। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ধানমন্ডি খেলার মাঠ চলে যাচ্ছে আবাসিক দখলে। রাজধানীর একেবারে কাছে নারায়ণগঞ্জের জিন্দাপার্কের কপালে পড়েছে রাজউকের থাবা। অবশ্য আন্দোলনের মুখে সরে এসেছে রাজউক। আর সবশেষ রাতারগুলেও চলছে সরকারের উদ্ভট সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে অবস্থিত রাতারগুল জলার বন (সোয়াম্প ফরেস্ট) হওয়ায় ১৯৭৩ সালে সংরক্ষিত ঘোষণা করে বন বিভাগ। প্রাকৃতিক এ জলার বনকে অপরিকল্পিপতভাবে জাতীয় উদ্যান তৈরির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। রাতারগুলে একটি আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রায় শেষের পথে। দেখভালের কথা বলে বানানো হচ্ছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। চারটি সিঁড়ির কাজ শেষ হয়ে এখন চলছে অন্যান্য কাজ। তৈরি করা হচ্ছে এক কিলোমিটার দীর্ঘ ১৫ ফুট চওড়া রাস্তা হবে যেটি শুরু হবে চিরিঙ্গি থেকে। বনের ভেতরে সৃষ্ট প্রাকৃতিক একটি মেঠোপথকে পাকা রাস্তায় রূপান্তর করা হবে। এ রাস্তার জন্য কাটা পড়বে অনেক গাছ। বাংলাদেশের একমাত্র সমৃদ্ধ জলার নয়নাভিরাম রাতারগুলে আছে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা হিজল-করচ-বরুণগাছের মায়াময় পরিবেশ। পাশাপাশি বেত, ইকরা, খাগড়া, মূর্তা ও শণজাতীয় গাছ রাতারগুলকে জলার বন হিসেবে অনন্য করেছে। বনে ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সঙ্গে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি ও নয় প্রজাতির উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাতারগুলের প্রাণ ও জীববৈচিত্য হুমকির মুখে পড়ারই কথা। বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক বন বা জলার বনে কোন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ বা বণ্যপ্রাণী-উদ্ভিদের ক্ষতি হয় এমন তাজ তরা থেকে বিরত রাখা হয়। বাংলাদেশই একমাত্র নিজের পরিবেশ ধ্বংস করতে নিজেই উঠেপড়ে লেগেছে। লালমনিরহাটের ডালিয়ায় তিস্তার পানির প্রবাহ গত কয়েক দশকের পরিসংখ্যানে মাত্র দশ শতাংশে নেমে এসেছে। জলবায়ুর অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। পরিবেশ বিপর্যয়ের সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রভাবেরও বেশি শিকার হতে হবে দক্ষিণ-এশিয়ার বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী এ দেশকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর বিশেষ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। সংবাদ মাধ্যমটির শুক্রবারের অনলাইন সংস্করণের একেবারে শীর্ষ খবর হিসেবে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্ভাব্য পরিণতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এমনিতেই কলকারখানা, অপরিকল্পিত নগরায়ন আর বর্জ্য অব্যবস্থাপনায় হুমকির মুখে দেশের প্রাণ-প্রকৃতি। এমন এক ক্রান্তিকালে আমরাই আমাদের খুনি, নিজেরাই ডেকে আনছি বিপদ। ধানমন্ডি খেলার মাঠ দখল, জিন্দাপার্ক উচ্ছেদের পাঁয়তারা আর রাতারগুলে অবকাঠামো নির্মাণের উত্সবে আজ রাতারগুলের মন ভালো নেই। এখানকার সাপ, বানর আর হিজল গাছগুলোর কান্না কি সরকারের কাছে কথনোই পৌঁছুবে না..?
লেখকসমূহ: গণমাধ্যম শিক্ষার্থী
