জন্মঅব্ধি জেনে এসেছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। এ কথা প্রচলিত আছে যে, তাঁর জন্ম না হলে নাকি বাংলাদেশেরই জন্ম হতো না। সেই ১৯৭১-এর কথা। তাঁর ডাকেই দেশ স্বাধীন হলো। আর আমরা হলাম স্বাধীন দেশের নাগরিক। সূর্যের আলোর মতই তো পরিষ্কার, বঙ্গবন্ধুই এদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, এদেশের স্থপতি। এ ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ অপরাপর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানও অনস্বীকার্য। হঠাত্ করে ৪৩ বছর পর প্রথম রাষ্ট্রপতি কে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশ ভুঁইয়ে থেকে এদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির ধারণা পাল্টে দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নন। পরের দফায় এও বলেছেন তিনি (বঙ্গবন্ধু) ছিলেন অবৈধ রাষ্ট্রপতি। তার এ বক্তব্যে সারা দেশে ঝড় উঠেছে। বিষয়টির সাথে একমত হয়েছেন কয়েকবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করা বেগম খালেদা জিয়াও। তিনিও তার পুত্রের সুরেই কথা বলেছেন। আমি মনে করি আর যা হোক, বেগম জিয়া সভা-সমাবেশে বক্তৃতায় সচরাচর দায়িত্বশীল কথাবার্তা বলেন। তার দেয়া রাজনৈতিক বক্তৃতায়ও শালীনতা থাকে। বঙ্গবন্ধু দেশে, শেখ মুজিবুর রহমান দেশে প্রথম রাষ্ট্রপতি নন এমন বক্তব্য তার কাছ থেকে পেয়ে দেশবাসীকে যারপর নাই মর্মাহত হতে হয়েছে। মহান মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান, বেগম জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমানের দল বিএনপি যারা করেন তারাও সবাই এ বক্তব্যে খুশি হয়েছেন বলে মনে করার কোন সুযোগ নেই। যারা তাদের দল করেন না, যারা মনে মনে ঐ দলকে সমর্থন করেন, তাদের (বিএনপি) ভোট দেন তারাও এ ব্যাপারে বেশ নাখোশ। সেদিন দেশের একজন ডাকসাইটে কলাম লেখক এবং রাজনৈতিক, যিনি কিনা প্রায়সই বিএনপির পক্ষ নেন (গঠনমূলক সমালোচনা করতে গিয়ে লেখা বিএনপির পক্ষে আসে) তিনিও বিষয়টির নিয়ে তার লেখায় বেশ সমালোচনা করেছেন। এনিয়ে সর্বস্তর থেকে সমালোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। যেখানে জীবদ্দশায় প্রেসিডেন্ট জিয়াও কখনো নিজেকে প্রথম রাষ্ট্রপতি দাবি করেননি সেখানে নতুন করে এনিয়ে দাবি ওঠায় প্রশ্নতো উঠবেই।
জিয়াউর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপতি বলায় তারেক রহমানের উদ্দেশে সেদিন প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ঐসময় (১৯৭১-এর পরের সময়টা) তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। জিয়াউর রহমান শুধুই একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, মুজিবনগর সরকারের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। জিয়াউর রহমান নির্বাচিতও ছিলেন না। তার কথা, ‘২৫ মার্চের আগে দেশের মানুষ কী জিয়ার নাম জানত? আসলে এসব ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। যারা ষড়যন্ত্র করছে ইতিহাসে তাদের নাম থাকবে না, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধুর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আরেক প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির জনক, স্বাধীনতার ঘোষক ও প্রথম রাষ্ট্রপতি- এটা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি। এটা যে অস্বীকার করবে সে সংবিধান লঙ্ঘন করবে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কটূক্তি করলে বর্তমান সংবিধানেই সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। আমি দুঃখিত দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি দাবি করায় জন্য। আমি সঙ্কিত, আমি ভীত এই ভেবে যে, সংবিধান লঙ্ঘনের দায় আবার আমার উপর গিয়ে না বর্তায়। তারেক জিয়া এমন দাবি করলে না হয় করুন, আমি এমন দাবি কিছুতেই করতে পারি না। যে অসত্য ইতিহাস শুনে গোটা জাতি আজ হতবাক, সে দাবি করা যায় না। বাঙালি হিসেবেতো নয়ই। জানি ইতিহাস একটাই হয় এবং তা বিকৃত করার সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্থপতি, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এটা সূর্যের আলোর মতই পরিষ্কার। আর এ আলো জ্বলে থাক অনন্তকাল।
এদেশের মানুষের ভুলবারতো কথা নয় যে, ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ঘটায় এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ আসনে জয় লাভ করার পর পাকিস্তানিরা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। আর তখনই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ৬ দফা ঘোষণা করেছিলেন মূলত সেটাই ছিল বাঙালির স্বাধীনতার সনদ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতা স্বাধীনতা ঘোষণার বক্তৃতা। স্বাধীনতা হলো এ দেশের মানুষের হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন। এ দেশের পাকিস্তানি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, মানুষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে তাই স্বাধীনতার ঘোষক এবং দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি সর্ম্পকে এত সস্তা ও অসত্য মন্তব্য করা কোন নাগরিকেরই উচিত নয়।
লেখক :সাংবাদিক
