কোরীয় সংস্কৃতির দখলে যাচ্ছে মনিপুর

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৪, ২২:১১
কোরীয় সোপ অপেরা দ্য হেয়ার্সের সূচনা সঙ্গীতটি শুরু হলেই বাকি পৃথিবীর কথা যেন ভুলে যায় ষোড়শী কিনচিত। যতই পড়াশোনা থাকুক, এটি তার দেখা চাই-ই-চাই। এ সময়টায় সে টলিভিশনের সামনের নির্দিষ্ট আসনটিতে লেগে থাকে আঠার মতো। কারণে-অকারণে সে কিছু কোরীয় শব্দও বলে। এর মধ্যে দুটি হল— সারাং হে (আমি তোমাকে ভালবাসি) ও আন্না সাইয়া (হেলো)। এতেও সন্তুষ্ট নয় কিনচিত। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে একটি বই কিনেছে, যেটির নাম— স্পিক কোরিয়ান উইথ মি ফর ফরেনার্স। এখানেই শেষ নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মনিপুরের রাজধানী ইম্ফালে অবস্থিত তার বাড়িতে সে ৮৫টি কোরিয়ান সিনেমা ও সোপ অপেরার সিডি সংগ্রহে রেখেছে। এক কথায় সে কোরিয়া বলতে পাগল। এর হেতু জিজ্ঞেস করাতে সে উত্তর দেয়, দক্ষিণ কোরীয় সিনেমা, ফ্যাশন, হেয়ার স্টাইল ও ভাষার ক্রেজ চলছে। মোদ্দাকথা, ওগুলো ব্রিলিয়ান্ট। রাজধানী দিল্লি থেকে ২,৪৩৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মনিপুরকে অনেকটা বিচ্ছিন্নই বলা চলে। বিশ্বায়নের এই যুগে দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতির ঢেউ এখানে বেশ ভালভাবেই আঘাত করেছে। তবে এটিই মূল কারণ নয়, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে এখানে সক্রিয় রয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলো; তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। এদের মধ্যে সবচে’ শক্তিশালী রেভ্যুলুশনারি পিপলস ফ্রন্ট ভারতীয়করণ রুখে দিতে ২০০০ সালে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে হিন্দী সিনেমার ওপর এবং বন্ধ করার আদেশ দেয় হিন্দী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। এতে বিপদে পড়ে যায় ক্যাবল অপারেটররা। কেননা আদেশ না মেনে যে উপায় নেই। আর সেই শূন্যতা পূরণেই এগিয়ে আসে কোরীয় সংস্কৃতি। প্রথমে দেখানো হতো শুধুমাত্র সিউলভিত্তিক ২৪ ঘন্টার ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ নেটওয়ার্ক আইরারাং টিভি। এর কিছুদিন পর থেকেই দেখানো শুরু হয় নাটক ও সিনেমা প্রধান কোরিয়ার কেবিএস ওয়ার্ল্ড, আর এটিকে লুফে নেয় মনিপুরবাসী। আজ ১৪ বছর পর হিন্দী টিভি চ্যানেলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়েছে; কিন্তু ততোদিনে যা হবার তাই হয়েছে। ইদানীং কোরীয় লুকের জন্য বিয়ের দিনে পর্যন্ত অনেক নারী পরচুলা ব্যবহার করে। কারো কারো ফেইসবুক প্রোফাইল রয়েছে কোরীয় নামে। মনিপুরের লোকজন ওই দেশটির নাটক ও সিনেমা বলতে পাগল। ওই ভাষার বিশেষ অনুষ্ঠান দেখার জন্য সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট পর্যন্ত নীরব হয়ে যায়। কোরিয়ার নির্মাতারাও বহির্বিশ্বে জনপ্রিয়তা বুঝে তাদের অনেক নাটক ও সিনেমার নাম দেয় ইংরেজিতে। এমনিতে মঙ্গোলিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে কোরীয় সাংস্কৃতিক রপ্তানি সামগ্রী বেশ জনপ্রিয়। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স (পিডব্লুসি)-এর তথ্যানুসারে, ৪৫.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব নিয়ে ২০১২ সালে বিশ্ববাজারে দক্ষিণ কোরীয় বিনোদন ও মিডিয়া শিল্পের র্যাংক ছিল সপ্তম। রিসার্চ স্কলার অতোজিত ক্ষেত্রিমায়ুম ও নিনগোম্বাম ভিক্টোরিয়া চানু লিখেছেন, প্রথম আঘাত করা কোরিয়ান তরঙ্গটি ছিল অর্থনৈতিক, যখন হুন্দাই, এলজি, ডাইয়ু ও স্যামসাং প্রবেশ করেছিল ভারতীয় বাজারে। দ্বিতীয় তরঙ্গটি ছিল সাংস্কৃতিক। যে অভিজ্ঞতাটা মনিপুর খুব ভালই লাভ করেছে। তারা মনে করেন, কোরিয়ান সংস্কৃতি মনিপুরে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পেছনে মূল যে ফ্যাক্টরটি কাজ করেছে, তা হল— উভয় অঞ্চলের মানুষ নরবংশগত ্বিভাজনে মঙ্গোলীয়। তার উপর উভয় সমাজ গোষ্ঠী সম্প্রদায়ভিত্তিক। ধর্মীয় কাঠামোর সাদৃশ্যের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত, নৃত্য ও লোক ক্রীড়ার দর্শনও এতে অবদান রেখেছে।