অপহূত আবুবকর সিদ্দিক নিরাপদে ফিরিয়া আসিয়াছেন। তাঁহার উত্কণ্ঠিত স্ত্রী-সন্তানের মুখে হাসি ফুটিয়াছে। ফিরিয়া আসিয়াছে স্বস্তি। কিন্তু জনমনে কি স্বস্তি ফিরিয়াছে? অবসান ঘটিয়াছে তাহাদের দীর্ঘ উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার? ইহার উত্তর ইতিবাচক হইলে আমরা স্বস্তি বোধ করিতাম। বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একটি অপহরণ, গুম ও খুনের ঘটনা সকল দেশে সব সময়েই ঘটিয়া থাকে। বিশেষ করিয়া বাংলাদেশের মতো দরিদ্র, জনবহুল এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থার দেশগুলিতে ইহা কোনো আকস্মিক বিষয় নহে। তবে স্বদেশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকাইলে বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক মাত্রই যে বিচলিত বোধ করিবেন তাহাতে সন্দেহ নাই। পরিসংখ্যান বলিতেছে, গত চার বত্সরে ২৬৮ জন অপহূত হইয়াছেন। তন্মধ্যে ১৮৭ জনেরই খোঁজ মিলে নাই অদ্যাবধি। লাশ হইয়া ফিরিয়াছেন এমন হতভাগ্য মানুষের সংখ্যাও প্রায় অর্ধশত। তুলনামূলক বিচারে আবু বকর সিদ্দিকের মতো সৌভাগ্যবান মানুষের সংখ্যা অতি নগণ্যই বলিতে হইবে। শুধু পরিসংখ্যানই-বা বলি কেন, আমাদের নৈমিত্তিক অভিজ্ঞতার সাক্ষ্যও ভিন্ন নহে। প্রায়শ অপহরণ, গুম ও খুনের ঘটনা ঘটিতেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপহূতদের সন্ধান মিলিতেছে না। অন্যদিকে, দায়ী ব্যক্তিরা থাকিয়া যাইতেছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে। সর্বোপরি, অনুদ্ঘাটিতই থাকিয়া যাইতেছে ঘটনার অন্তর্নিহিত রহস্য। অতএব, উদ্বিগ্ন না হইয়া উপায় কী? আর এই উদ্বেগ যে কেবল ভুক্তভোগী পরিবারসমূহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি রাজনীতির ক্ষেত্রে বিরাজমান চরম অবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতার আগুনে এই ধরনের ঘটনা যে ঘৃতাহুতি করিতে পারে— সেই আশঙ্কাও অগ্রাহ্য করিবার মতো নহে।
ইহা অনস্বীকার্য যে, একটি স্থিতিশীল সমাজের যতো বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে তন্মধ্যে নিরাপত্তার স্থান সবার উপরে। সর্বপ্রকার উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান পূর্বশর্তও হইল এই নিরাপত্তা। কোনো কারণে নাগরিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইলে বা বিঘ্নিত হইবার আশঙ্কা দেখা দিলে তাহার নেতিবাচক প্রভাব সর্বত্রই পড়ে বা পড়িতে বাধ্য। সঙ্গত কারণেই জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্বটি রাষ্ট্র বা সরকারের কাঁধেই বর্তায়। আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ প্রসঙ্গে নানাভাবে রাষ্ট্রের এই দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার উপরই গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, সাম্প্রতিককালে জননিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অপহরণ, গুম ও খুনের যেইসব খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছে বা হইতেছে তাহাতে কতগুলি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকলেই ইহার শিকার হইতেছে; দ্বিতীয়ত, ক্ষেত্রবিশেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করা হইলেও অপহরণকারীদের প্রকৃত পরিচয় স্পষ্ট নহে; তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কোন্দল হইতে শুরু করিয়া জমিজমাসম্পর্কিত পারিবারিক বিরোধ কিংবা নিছক চাঁদাবাজির কারণেও অপহরণের ঘটনা ঘটিতেছে। এইসব অপকর্মের জন্য যে বা যাহারাই দায়ী হউক, শেষাবধি সকল দায়দায়িত্বই বর্তাইতেছে সরকারের উপর। অতএব, যেইভাবেই দেখা হউক না কেন, সরকারের পক্ষে ইহার দায়দায়িত্ব উপেক্ষা বা অস্বীকার করা সম্ভব নহে।
বিষয়টিকে নানাভাবে দেখা যায়। তন্মধ্যে নাগরিক তথা জনগণের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের বিষয়টি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। স্পষ্টতই তাহারা এইক্ষণেই সর্বপ্রকার অপহরণ, গুম ও খুনের অবসান দেখিতে চায়। চায় অপহূতদের প্রত্যাবর্তন এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। তবে প্রত্যাশাটি যতোটা সরল, কাজটি যে মোটেও ততটা সহজ নহে তাহা না বলিলেও চলে। পাশাপাশি, ইহাও অনস্বীকার্য যে কাজটি যতো কঠিনই হউক না কেন, ইহা এড়াইয়া যাইবার কোনো উপায় নাই। সরকারকে এই ক্ষেত্রে নিজেদের সাফল্য দেখাইতে হইবে তাহাই নহে, একই সাথে ইহাও প্রমাণ করিতে হইবে যে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে তাহাদের সদিচ্ছার কোনো অভাব নাই। ইহার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করিয়া বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইবার পাশাপাশি ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অবশ্যই সর্বাত্মক ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এই ক্ষেত্রে সামান্যতম শৈথিল্য বা অস্বচ্ছতাও যে আখেরে সরকারের নিজের জন্যই ক্ষতিকর— তাহা কি বলিবার অপেক্ষা রাখে?
