সংকটের আবর্তে সরকারি মাধ্যমিক স্তর

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৪, ২২:১৯
শিক্ষা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো মাধ্যমিক শিক্ষা। এ স্তরে শিক্ষা লাভ করে দেশের বিরাট জনশক্তি আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তাই আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্বে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার বিবেচনা করে এ ক্ষেত্রকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করার জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। নতুন প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে সত্, নিষ্ঠাবান, চরিত্রবান, দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করার জন্য বর্তমান সরকার শিক্ষানীতিতে বেশকিছু পরিবর্তন এনেছেন যা বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। সরকারের ১ম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, ৪০% গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত যা সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উদ্ভূত সংকট সবাইকে বিচলিত করেছে। বর্তমানে ৩২৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২১৪ জন প্রধান শিক্ষক ১২৩ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও ১৫৩২ জন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এ মহাশূন্যতার মধ্য দিয়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা কিভাবে সম্ভব তা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ সংকটের জন্য সরকারকে দায়ী করা হলেও বাস্তবতা অন্যক্ষেত্রে নিহিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণি পদমর্যাদা ঘোষণা দেয়া হলেও প্রশাসনের একটি মহলের উদাসীনতার কারণে দীর্ঘ ২ বছরেও এর বাস্তবায়ন পুরোপুরি সম্ভব হয়ে উঠেনি, প্রশাসনের এ বিশেষ মহল শিক্ষকদের মর্যাদার ব্যাপারে বরাবরই নিরুত্সাহিত করেছেন। কিন্তু সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছার কারণে এটি বাস্তবায়ন এখন দ্রুত প্রক্রিয়াধীন। প্রশাসনের এ বিশেষ মহলের অনিহার কারণে দীর্ঘদিন পর্যন্ত শিক্ষকদের নিয়োগ বিধি ঝুলে আছে। সুনির্দিষ্ট নিয়োগ বিধি না থাকার কারণে পি.এস.সি. শূন্যপদে শিক্ষকদের নিয়োগ অনুমোদন দেননি। তাই এ সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সরকারের প্রভাবশালী মহলের এ বিষয়ে আন্তরিক হওয়া খুবই প্রয়োজন। এ বিষয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনের মতে, “সরকারের অগ্রাধিকার খাতগুলোর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম, শিক্ষার মান উন্নয়নে সদিচ্ছার অভাব না থাকলেও সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে সংকট থেকেই যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের তুলনায় শিক্ষকের আনুপাতিক হার এতই কম যে, তা হতাশাব্যঞ্জক, “তাছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থাকলেও সারা দেশের বিশালসংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজকে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনা কঠিন ব্যাপার। প্রশাসনিক সুবিধার্থে ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ৬৪টি জেলা শিক্ষা কার্যালয় থাকলেও অধিকাংশ কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে। প্রেষণে এনে অদক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে সুষ্ঠুভাবে শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার মত মাধ্যমিক শিক্ষায় গতিশীলতা নেই। পদোন্নতি ধীর গতি, শূন্যপদ পূরণে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের অভাব। বরং উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে দিয়ে সমন্বয়ের নামে সারা দেশে হাজার হাজার শিক্ষক বদলীর আতঙ্ক ছড়িয়ে নতুন সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বদলী বন্ধ রেখে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শিক্ষকতা কোন প্রশাসনিক পদ নয়। তাছাড়া পাঠদান সফল ও সহায়ক হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীকে বুঝতে, জানতে অবশ্যই শিক্ষককে সময় দিতে হবে। ঘন ঘন বদলী সফল শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ইতোপূর্বে তারা নিয়মিত কর্ম সম্পাদনে অবহেলা করে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে এডহক ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ করে সরকারের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতার কারণে তা হয়ে উঠেনি। এসব কারণে সরকারি মাধ্যমিক স্তর প্রতিনিয়ত সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। যে সরকারি মাধ্যমিক স্তর শিক্ষার গুণগত মানের ধারক ও বাহক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল তা এখন হুমকির সুখে। এ অবস্থা উত্তরণের জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক নির্বাচন ও নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষামূলক তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন করা অতীব প্রয়োজন। তাছাড়া আকর্ষণীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা জরুরি। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক কোচিং সংক্রান্ত নীতিমালা মেনে নিয়েছেন, শিক্ষকদের কোচিং বন্ধের পাশাপাশি অনভিজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত কোচিং বাণিজ্য বন্ধের ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষার গুণগত মানে বিপর্যয় ঘটবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে ব্যাচে ৪০ জন সমেত কোচিং করার অনুমতি শিক্ষার স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করবে। এ বিষয়ে সরকার এখনই ব্যবস্থা না নিলে যে উদ্দেশ্যে কোচিং বন্ধ করা হয়েছে তা ব্যাহত হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় কোচিং সমর্থনযোগ্য নয়, তবে শিক্ষকদের মর্যাদাকর জীবন যাপন নিশ্চিত না করে মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, শিক্ষামন্ত্রীর বিভিন্ন সময়ে দেয়া অঙ্গীকার শিক্ষকদের জন্য গ্রহণযোগ্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের মর্যাদাকর জীবন যাপন নিশ্চিত করে মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন। তবেই মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। লেখক:গবেষক ও জেনারেল সেক্রেটারি, বাংলাদেশ টিচার্স ফেডারেশন। (এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল অধিভুক্ত) e-mail:[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন