স্থায়ী ব্রিজ করিতে হইবে

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪১
বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক ব্রিজ-কালভার্টের অবস্থা শোচনীয়। তন্মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় দেশের অসংখ্য বেইলি ব্রিজ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া পড়িয়াছে। কয়েক দিন আগে ইত্তেফাকের মফস্বল পাতায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয় যে, ১৯৯৫ সালে নেত্রকোনা-দুর্গাপুর সড়কে জারিয়া কংস নদীর উপর নির্মিত বেইলি ব্রিজটি এখন পরিণত হইয়াছে মরণ ফাঁদে। গত ১৫ বত্সরে এই সেতুতে দুর্ঘটনায় কমপক্ষে নিহত হইয়াছেন ২৩০ জন। এই এলাকায় ট্রাক-বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ব্রিজটির প্রশস্ততা কম হওয়ায় দুইপ্রান্তে যানজট ও দুর্ঘটনা লাগিয়াই আছে। সেতুটির কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এই বিভাগের স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলীর মতে, নেত্রকোনার চারটি বেইলি সেতুর পাকাকরণের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হইয়াছে। কিন্তু কংস নদীর বেইলি ব্রিজটি তুলনামূলকভাবে বড় এবং এইখানে পাকা সেতু নির্মাণে ব্যয় হইবে ১০ কোটি টাকা। কিন্তু তাহাদের নিকট কোন বরাদ্দ না থাকায় এইখানকার বেইলি ব্রিজটির পরিবর্তে পাকা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হইতেছে না। আমরা জানি, বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হয় ক্ষণস্থায়ীভাবে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাকা সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা রাখিয়া পিলারের উপর এই সেতু নির্মাণ করা হয়। সাধারণত ৩-৫ বত্সর পর পর ইহার সংস্কার করা দরকার হইয়া পড়ে। কিন্তু অনেক ব্রিজের বয়স ২৫-৩০ বত্সর পার হইয়া গেলেও সংস্কার করা হয় না। ব্রিজগুলি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আরও কতিপয় কারণ আছে। প্রথমত জনগণের অসচেতনতার কারণে অনেক সময় ব্রিজের পাত ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ খুলিয়া নিয়া যায় দুর্বৃত্তরা। দ্বিতীয়ত মাত্রাতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচল করিবার কারণে ইহা ক্রমেই দুর্বল হইয়া পড়ে। নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ টনের বেশি মালামাল বহন করা যায় না। তবে অনেক সময় ২০ টন মালামাল নিয়াও যানবাহন চলাচল করে। ফলে প্রায়শ পত্র-পত্রিকায় বেইলি ব্রিজ ভাঙ্গিয়া বাস, ট্রাক প্রভৃতি যানবাহন দুর্ঘটনায় কবলিত হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়। অভারলোডেড যানবাহন চলাচলের কারণে বেইলি ব্রিজগুলি টেকসই হয় না, দ্রুত নষ্ট হইয়া যায়। মটরযান আইনের ১৫৪ ধারা অনুযায়ী অনুমোদিত ওজন অতিক্রমপূর্বক গাড়ি চালাইলে ৫০০ টাকা জরিমানা দেওয়ার বিধান রহিয়াছে। ব্রিজগুলি রক্ষায় এই আইনেরও কোন প্রয়োগ কিংবা উপযোগিতা আর নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে বেইলি ব্রিজের উন্নতি সাধিত হয়। ইহার মডেল তৈরি করেন ডোনাল্ড বেইলি ও তাহার নামেই এই ধরনের ব্রিজের নামকরণ হয়। ১৯৪২ সালে উত্তর আফ্রিকায় ব্রিটিশরা সর্বপ্রথম এই ধরনের ব্রিজ তৈরি করে। পরে আমেরিকান সামরিক ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটও ইহার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। সাধারণত বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করা হয় যুদ্ধকালীন বা বিশেষ পরিস্থিতিতে। ইহার সুবিধা হইল, এই ব্রিজ নির্মাণের জন্য বিশেষ বা ভারি কোন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য অনুযায়ী এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে সারা বাংলাদেশে ব্রিজের সংখ্যা ৪৬৫৯টি। তন্মধ্যে স্টিল ও টিম্বার ডেকের বেইলি ব্রিজের সংখ্যা যথাক্রমে ১০০৫ ও ৮২টি। ইহাছাড়া এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনেও বেইলি ব্রিজ রহিয়াছে। ব্রিটিশ আমল হইতেই বাংলাদেশে বেইলি ব্রিজ নির্মাণ চলিয়া আসিতেছে। একসময় বেইলি ব্রিজের জন্য অনুদান দেওয়া শুরু করে জাপান। তাহার পর চীন ও ভারত হইতে বেইলি ব্রিজের যন্ত্রাংশ কেনা শুরু হয়। কিন্তু মান ভাল না হওয়ায় অনেক সময় রাত্রে ব্রিজের শব্দে স্থানীয় লোকজনের ঘুম হারাম হইয়া যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেইভাবে বিকশিত হইতেছে এবং নূতন নূতন সম্ভাবনা তৈরি হইয়াছে, তাহাতে এই দেশে বেইলি ব্রিজের প্রাসঙ্গিকতা আর নাই। এইখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। মহাপরিকল্পনা গ্রহণপূর্বক এবং অগ্রাধিকার নির্ণয় করিয়া স্থায়ী ও মজবুত ব্রিজ নির্মাণ সময়ের দাবি। এইক্ষেত্রে সুবিধাজনক হইল, বাংলাদেশে নির্মিত বেইলি ব্রিজের ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে যে ভিত্তি দেওয়া হইয়াছে তাহা মজবুত। ইহার ভিত্তিতে ক্রমান্বয়ে হইলেও শক্তিশালী ব্রিজ নির্মাণ করা আবশ্যক। এই ব্যাপারে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়া অগ্রসর হইতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন