চাষবাস

অনাবৃষ্টি ও বৃষ্টিনির্ভর ধান

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৩
ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। এদেশের জমি ও আবহাওয়া ধান চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। বাংলাদেশে বিভিন্ন মৌসুমে আবহমানকাল থেকে এ ফসলের চাষ হয়ে আসছে। এ দেশের আবাদি জমির শতকরা প্রায় ৭৫-৮০ ভাগেই ধানের চাষ হয়। আর শতকরা প্রায় ৯২ জনই হলো ধান চাষী। এ দেশের প্রত্যেকটি জেলার আনাচে-কানাচে বছরের বিভিন্ন মৌসুমে আউশ, আমন, বোনা আমন ও বোরো ধানের চাষ হয়। মাঠ ভরা সোনালি ধান দেখে আন্দোলিত হয় কৃষকের মন। আর সেই ধান ঘরে উঠার সাথে সাথে শুরু হয় নবান্নের উত্সব। এমনকি পূজা পার্বণে ও প্রথা বা রেওয়াজ হিসেবে অন্যান্য উপকরণের সংগে ধান ব্যবহার করা হয়। গ্রাম বাংলার মানুষের সারা বছরের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবেও ধান বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সুতরাং ধানই আমাদের ধন, আর ধানই প্রাণ। যে মৌসুমে সাধারণত মাটিতে রসের এই ঘাটতি অব্স্থা থাকে তাকে খরা মৌসুম বলে। খরা অব্স্থায় চারা গাছ অতি সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারিগরি বিবেচনায় চৈত্র থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত অবিরত ২০ দিন বা এর বেশি বৃষ্টি না হলে তাকে খরা বলা যেতে পারে। খরার কারণে শতকরা ৩০-৭০ ভাগ পর্যন্ত ফসলহানি হতে পারে। বাংলাদেশে প্রত্যেক বছর অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ফসল খরার কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে বোনা আউশ, বোনা আমন ও রোপা আমন ধান প্রধানত বৃষ্টির পানির উপর নির্ভর চাষ করা হয়। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের জন্য এসব ধান চাষে প্রত্যেক বছর সমস্যা সৃষ্টি হয়। অধিক উত্পাদনের সকল উপকরণ যথা উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার, কীটনাশকের ব্যবহার অনেক সময় অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায় অনিয়মিত বৃষ্টির জন্য। এদেশে বিগত কয়েক বছরের বৃষ্টিপাতের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, চৈত্র থেকে বৈশাখ মাসের শেষ পর্যন্ত মাঝে মধ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি অথবা পর্যাপ্ত বৃষ্টির পর অনাবৃষ্টি জনিত খরায় আক্রান্ত হয়েছে আউশ ও বোনা আমন। অপরদিকে মৌসুমী বৃষ্টি আগাম থেমে যাওযায় রোপা আমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবশ্য একথা ঠিক যে, বৃষ্টির পর জমির পানি ক্রমেই শুকিয়ে যাবে। এ সংগে পার্থক্য দেখা দেবে বিভিন্ন জমিতে পানি শুকিয়ে যাবার গতি ধারায়। জমিতে পানি ধরে রাখার এ পার্থক্য ধানের ফলনে ব্যাপক পার্থক্য সৃষ্টি করে থাকে। এক গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায় যে, বৃষ্টি থেমে যাবার পর ৫ দিন পানি ধরে রাখতে পারে এমন জমিতে আউশ ও আমন দুই ফসল মিলিয়ে উত্পাদন হয়েছে হেক্টর প্রতি ২২২৫ কেজি। পক্ষান্তরে ১০ অথবা ১৮ দিন পানি ধরে রাখতে পারে এমন জমিতে হেক্টর প্রতি উত্পাদন হয়েছে যথাক্রমে ৬১৮৫ এবং ৬৫৯৫ কেজি (সাঈদ, ১৯৮৬ ইং)। এতে দেখা যাচ্ছে যে, জমিতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা যতই বাড়ছে ফলনও ততই বাড়ছে। যদিও উত্পাদনের অন্যান্য উপকরণ সবক্ষেত্রে সমান ছিল। তাই বৃষ্টি নির্ভর ধান চাষে খরা সমস্যা এড়ানোর জন্য যে সব ব্যবস্থা নিতে হবে তা নিম্নে বর্ণিত হলো : (১) মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য গভীরভাবে জমি চাষ দিতে হবে। (২) জমির আইল মজবুত করে বেঁধে দিতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি জমি থেকে সরে না যায়। (৩) শেষ চাষের পর মই ও কোদাল দিয়ে জমি ভালভাবে সমতল করে তৈরি করতে হবে, এতে জমির সর্বত্র সমান উচ্চতায় পানি থাকে। ফলে পানির অপচয় কম হয়। (৪) বোনা আউশ ও বোনা আমন ধানের বীজ মাটির কিছুটা গভীরে বপন করতে হয়। (৫) নাবী রোপা আমনের পরিবর্তে যথাসম্ভব আগাম রোপা আমন ধানের চাষ করা উচিত, যাতে আশ্বিন-কার্তিক মাসের খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কম হয়। (৬) আর্দ্রতা সংরক্ষণের জন্য যথাসময়ে আচড়া বা নিড়ানি দিয়ে কিংবা কুপিয়ে মাটির উপরের স্তর ভেঙ্গে ঝুরঝুরে করে দেয়া উচিত। (৭) জমির কোণায় কোণায় গর্ত করে রাখতে হবে। এতে বৃষ্টির পর গর্তে পানি জমা হবে এবং সেই পানি ক্ষেতে ছিটিয়ে দিতে হবে। (৮) জমিতে পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। এতে মাটিতে পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এমনকি বেলে দো-আঁশ মটিতে পানির অপচয় হ্রাস পায়। যেহেতু ধান আমাদের দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য। আমাদের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ক্যালোরির শতকরা প্রায় ৮০ ভাগই আসে ভাত থেকে। কাজেই বৃষ্টি নির্ভর ধান চাষ সমপ্রসারণ ও ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উল্লেখিত প্রযুক্তিসমূহ চাষীদের মাঝে ব্যাপক প্রচার ও তা মাঠে প্রয়োগের দ্রুত কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়া একান্ত প্রয়োজন। লেখক : উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন