সমর্থন কখনো চাপ হতে পারে না

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৫৪
সাঙ্গাকারা ও জয়াবর্ধনে একটা বড় সংশয় ছিল যে, শ্রীলঙ্কার দুই গ্রেট ক্রিকেটার হয়তো কোনো বৈশ্বিক ট্রফি না জিতেই ক্যারিয়ার শেষ করে ফেলবেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষ টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে এসে একটি ‘বিশ্বকাপ’-এর স্বাদ পেলেন কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে। এই দারুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে দুজন একসাথে বসে কথা বলেছেন ক্রিকইনফোর সঙ্গে। এই সাক্ষাত্কারে জয়াবর্ধনে ও সাঙ্গাকারা নিজেদের সব প্রাপ্তির কৃতিত্ব দিলেন সমর্থকদের— টানা চার ফাইনাল হারের স্মৃতিটা কী এই ফাইনালের আগে তাড়া করছিল? জয়াবর্ধনে:হ্যাঁ, করছিল। বিশেষ করে ২০১১ আর ২০১২ সালের ফাইনাল দুটোর হার। এই দুটো ফাইনালের আগে আমরা খুব পরিকল্পনা করে, প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম। এর আগের ফাইনালগুলোতে অতো ভালো পরিকল্পনা করতে পারিনি। আমি আর কুমার, দুজনই তখন তরুণ ছিলাম; ফলে সে সময় অনেক আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ দুটো ফাইনাল নিয়ে আমাদের খুব প্রস্তুতি ছিল। বিশেষ করে নিজেদের দর্শকের সামনে অনেকটা ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নেমে সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি ফাইনালের হারটা হজম করা খুব কঠিন ছিল। সাঙ্গাকারা:আমরা যখন ফাইনালে উঠলাম, প্রথমেই মনে হল—হেরে গেলে কী হবে? আমরা কী পাঁচটা ফাইনাল হারতে যাচ্ছি? এই চিন্তাকে আপনি কিভাবে সামাল দেবেন! আসলেই অনেক বড় সমস্যা ছিল এটা। এশিয়া কাপের ফাইনাল জেতাটা কী এই বাঁধ ভাঙ্গার ব্যাপারে একটু সাহায্য করেছিল? জয়াবর্ধনে:তা খানিকটা বলা যায়। যেভাবে আমরা ভাইলে নিজেদের আত্মবিশ্বাসটা ধরে রাখতে পেরেছিলাম, যেভাবে শেষ করেছিলাম; সেটা নিশ্চয়ই টি-টোয়েন্টি ফাইনালেও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। এশিয়া কাপ জেতার পর ছাদখোলা বাসে আপনাদের অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। এটা কী আপনাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল? জয়াবর্ধনে:সত্যি বলি, আমরা এশিয়া কাপের পর আসলে এমন অভিনন্দন আশা করিনি। তবে এ থেকে একটা ব্যাপার বুঝেছিলাম যে, মানুষ কতোটা ভালোবাসে দলকে। দেখুন, ২০০৭ সালে আমরা যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে ফাইনাল হেরে ফিরলাম, তখনও আমাদের ছাদ খোলা বাসে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। বৃষ্টিতে ভিজে লোকজন রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এ ধরনের সমর্থন কী ক্রিকেটারদের বাড়তি চাপে ফেলে? নাকি অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়? সাঙ্গাকারা:অবশ্যই এটা অনুপ্রেরণার উত্স। মাহিয়া (জয়াবর্ধনে) ২০০৭ সালের কথা বলছিল, আমি সে সময় ভাবছিলাম, ইস, এ মানুষগুলো একটা বিশ্বকাপ পেলে আরও কতো আনন্দ পাবে! এই সমর্থনের চেয়ে বড় প্রাপ্তি ক্রিকেটারের জীবনে আর কী হতে পারে! দেখুন, ব্যাপারটা এরকম নয় যে, আপনি ভাববেন, কতো লোক খেলা দেখছে; যদি হেরে যাই! আমরা বরং ভাবি, এটা আরেকটা সুযোগ এই মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর। দর্শকের সমর্থন চাপ নয়, প্রেরণা। জয়াবর্ধনে:আমরা ফেরার গল-ফেসে যে উত্সব হয়েছিল, তা আমি জীবনেও দেখিনি। আমি কল্পনা করতে পারি, কী উন্মাদনা ছিল এখানে ফাইনালের রাতে। এই সমর্থন, উচ্ছাস চাপ হবে কেন? শ্রীলঙ্কার দর্শকদের ঠিক কোন জায়গাটায় এগিয়ে রাখবেন? জয়াবর্ধনে:তারা দলকে বুকে জড়িয়ে রাখে, তারকাদের নয়। আমাদের দর্শকরা খুব ভালো করে জানে, তারকা যাবে-আসবে। কিন্তু আসল ভালোবাসার জায়গাটা যে দল, সেটি ঠিক থাকবে। আমরা যুগের পর যুগে অনেক গ্রেট খেলোয়াড়দের পেয়েছি; তাদের ভক্তও ছিল। কিন্তু সেই ভক্তরা ওই গ্রেটের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলা দেখা বন্ধ করেনি। এটাই আমাদের সমর্থকদের শ্রেষ্ঠত্ব। আপনারা এ টুর্নামেন্টটা খেলতে আসার আগে বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি-টুক্তি নিয়ে অনেক ঝামেলা হচ্ছিল। সেগুলো আপনাদের ওপর প্রভাব ফেলেনি? সাঙ্গাকারা:এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মাঝের সময়টায় অনেক অনিশ্চয়তা ছিল। যখন টি-টোয়েন্টি খেলতে যাই, তখনো ঝামেলা ছিল। কিন্তু আমরা ভেবেছি, এই যে লাখো লাখো মানুষের সমর্থন, এর সঙ্গে আমাদের নিজেদের স্বার্থে অন্যায় করা যাবে না। কাজটা কঠিন ছিল, তারপরও আমরা আমাদের কাজেই মন দিয়েছি। জয়াবর্ধনে:আমরা যখন শ্রীলঙ্কা ছাড়ি, তখন বলছিলাম, ‘দ্যাখো, যে ব্যাপারে আমাদের হাত নেই, তা এখন ভুলে যাওয়া ছাড়া আর করার কিছু নেই। আমরা এখন ভালো খেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না।’ ট্রফির ব্যাপারটা বাদ দিলে শ্রীলঙ্কা গত প্রায় এক দশকে সবচেয়ে ধারাবাহিক দল। এর রহস্যটা কী? মাহেলা:আমরা হারতে পছন্দ করি না। হারলে খুব খারাপ লাগে। বিশ্বাস করবেন না, অনুশীলনে যে মজার ফুটবল হয়, ওখানে হারার পরও পরাজিত দলের খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে আলাপ করে, কেন হারলাম। সাঙ্গাকারা: ধারাবাহিকতার ব্যাপারটায় আমার একটা জিনিস মনে পড়ছে। একবার একটা কার্টুন দেখেছিলাম। একটা বাচ্চা জিজ্ঞেস করছে, ‘বাবা, আইসিসি টুর্নামেন্ট কাকে বলে?’ বাবা বলছে, ‘সারা পৃথিবীর দল ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলার জন্য যে টুর্নামেন্টে লড়ে, সেটাকে আইসিসি টূর্নামেন্ট বলে।’ অবশ্যই এটা আমাদের বড় একটা প্রাপ্তি। আমরা সবসময় নিজেদের সামনে ঠেলার চেষ্টা করছি। শীত-গ্রীষ্ম দেখি না, ছুটি খুব একটা নেই না। দেখুন, আমরা নিজেদের সৈনিক ভাবতে পছন্দ করি। ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল জয়ের একটা বাড়তি তাগিদ টের পাচ্ছিলেন? সাঙ্গাকারা:সত্যি কথা হল, আমরা ফাইনালে নিজেদের এবার আশা করিনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১১৯ রান করার পর হেরেই তো গিয়েছিলাম। ফলে ফাইনালে আমরা অনেক ভারমুক্ত ছিলাম। শুধু ভাবছিলাম, সেবার ভারতের বিপক্ষে হেরে গিয়েছিলাম। এবার হারাতে পারলে ব্যাপারটা মধুর হবে। কখনো কী ভেবেছিলেন, একটাও বড় টুর্নামেন্ট না জিতেই ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে? জয়াবর্ধনে:(হাসি) আর কী হত! আমার সিভিতে কোনো বিশ্বকাপ লেখা থাকতো না। আসলে এটা আমরা প্রকাশ্যেও বলেছি যে, আমাদের আর খুব বেশি সময় নেই, খুব বেশি সুযোগ নেই। ফলে একটা বিশ্বকাপ জেতাটা দরকার ছিল। সাঙ্গাকারা:সত্যি বলি, নিজেদের নিয়ে অতোটা ভাবছিলাম না। শুধু চারটে ফাইনালের কথা ভাবছিলাম। মাহেলাকে বললাম আরেকটা ফাইনাল হারলে কী করবো? ও বলেছিল, ‘মনে হয় একটা গাছ খুঁজে গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়তে হবে।’