২০১৪-২০১৫ বছরের বাজেট আসন্ন। এ বছরের বাজেট কেমন হতে যাচ্ছে এখন থেকেই সে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণত দেখা যায়, বাজেট ঘোষণার পর পরই প্রায় প্রতিটি দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যায়। খুব স্বল্প সংখ্যক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যই আছে যার মূল্য কমে। এবারে বাজেট ঘোষণার পূর্বেই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুত্ এমন একটি অত্যাবশ্যকীয় জ্বালানি শক্তি যার মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিটি দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষরা এমনিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে হিমশিম খাচ্ছে তার উপর নতুন করে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে চোখে সরষে ফুল দেখতে শুরু করেছেন। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই দরিদ্র নয়তো হতদরিদ্র।
বিশ্ব ব্যাংকের মতে, দৈনিক ১.২৫ ইউ এস ডলারের নিচে যাদের মাথাপিছু আয় তারাই দরিদ্র। তারা বিশ্বায়ন, বাজার ব্যবস্থা, অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি বোঝে না। তারা শুধু বোঝে এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়ছে নাকি কমছে? এমনিতে বিগত কয়েক বছরে খাদ্যদ্রব্য, শিক্ষার উপকরণ, স্বাস্থ্যসেবার উপকরণ অর্থাত্ ওষুধপত্র, বাড়িভাড়া বিভিন্ন ইউটিলিটিসহ প্রতিটি দ্রব্যের মূল্য যেহারে বেড়েছে আয় বাড়েনি সেভাবে। আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি না হওয়ায় বাঁচার তাগিদে কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত হচ্ছে আবার কেউবা আরও বিলাসী জীবনযাপনের জন্য দুর্নীতি করছে। দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির কারণ একদিকে চাঁদাবাজ, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত সমস্যা, সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব ইত্যাদি কারণে উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আরও একটি অন্যতম কারণ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিগত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ১.৪ বিলিয়ন অর্থাত্ ১০৮৫৭ কোটি টাকার উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে। যা মোট জিডিপি’র ১ শতাংশেরও বেশি। সিপিডি’র হিসাব মতে পরিবহন, পোষাক শিল্প, কৃষি এবং পর্যটন শিল্প খাতে হরতাল এবং অবরোধের কারণে ৪৯০১৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতির মধ্যে সেবামূলক খাত ৮৬ শতাংশ, ১১ শতাংশ শিল্প এবং বাকি ৩ শতাংশ কৃষি খাত। এ ক্ষতির ফলে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬.২ শতাংশ থেকে কমে ৫.৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এসব কারণে প্রান্তিক চাষিরা ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পথে বসার উপক্রম হয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবহন খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতি। কৃষি এবং পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে কৃষকরা তাদের উত্পাদিত পণ্য সুষ্ঠুভাবে বাজারজাতকরণের অভাবে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ১৫ কোটি মানুষের দেশে ১৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দুর্দশাগ্রস্ত, অসহায় ও বঞ্চিত। বাকি ২০ লাখ মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত। এর ফলে শ্রেণীবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেলেও এর সুফল সকল শ্রেণী পেশার মানুষ পাচ্ছে না। একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর মধ্যে এর সুফল সীমাবদ্ধ। মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর হাতে অঢেল অর্থ পুঞ্জিভূত হয়েছে। নগরীতে বিশাল বিশাল অট্টাালিকা, বিপণী বিতান/শপিংমল, নতুন নতুন মডেলের গাড়িতে ভরে গেছে রাস্তাঘাট। অন্যদিকে গৃহহীন ভাসমান মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া হওয়া উচিত প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে বণ্টন ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণের।
বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকাতে ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগযোগ্য অর্থ থাকার পরও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি। অথচ উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন উন্নত অবকাঠামো। উন্নত অবকাঠামোর সাথে বিনিয়োগ সম্পর্কিত। বিনিয়োগ না হওয়াতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। দেশে বেকারের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে। জানা যায়, দেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটিরও উপরে। এ বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় উত্পাদন বাড়ছে না ফলে আয় বাড়ছে না, আয় না বাড়াতে সঞ্চয় বাড়ছে না, প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে, প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হবে না। দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাবে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হবে না।
আমাদের যেটুকু সম্পদ আছে সেটুকু সুষমভাবে বণ্টন না হওয়ার ফলে একদিকে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে দরিদ্ররা আরও হতদরিদ্র হচ্ছে। এবারের বাজেটে আঞ্চলিক ভিত্তিতে উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। বিভাগীয় শহরগুলোতে কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল ও ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের উপর জোর দিতে হবে। নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নই তার মর্যাদা ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে না পারলে এ জনসংখ্যা পরিবার, সমাজ তথা দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি জেলায় জেলায় উন্নতমানের বৃত্তিমূলক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এজন্য এ খাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। বাজেট শুধু বরাদ্দ রাখলেই চলবে না বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে সময় মত ছাড় হয় এবং স্বচ্ছতার সাথে ব্যয় হয় সেদিকে সুদৃষ্টি রাখতে হবে। দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত জনসংখ্যাকে বিদেশে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ রেখে সময়মত অর্থ ছাড়সহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাতে প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এক বিরাট বৈষম্য বিরাজ করছে। বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা দূর করার জন্য বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এ জন্য শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়াতে হবে।
এবারের বাজেটে উত্পাদনমুখী নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। শিল্পখাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পখাতে। কারণ এ খাতে স্বল্প মূলধন বিনিয়োগ করে অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। আমাদের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দেশে ৬০ লাখ লোকের আয়কর দেয়ার ক্ষমতা থাকলেও আয়কর দেন মাত্র ১৩ লাখ। অর্থাত্ টিআইএনধারীর সংখ্যা মাত্র ১৩ লাখ। এজন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ধরে টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং অনলাইন পদ্ধতিতে আয়কর গ্রহণের ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করতে হবে যাতে রাজস্ব আয় কেউ অবৈধ উপায়ে ফাঁকি দিতে না পারে। রূপকল্প ২০২১ কে সামনে রেখে ২০১৪-১৫ এর বাজেট যাতে বিনিয়োগবান্ধব ভারসাম্যপূর্ণ এবং বৈষম্যহীন হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট সকলে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক:গবেষক
[email protected]
