সম্প্রতি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের তরঙ্গমূল্যসহ বিভিন্ন ফি-এর উপর আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হ্রাস করার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই ঘোষণা অনুযায়ী এখন থেকে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রদেয় ভ্যাট ১৫ শতাংশের পরিবর্তে হবে ১০ শতাংশ। গ্রাহকরা যাতে তুলনামূলকভাবে কম দামে ইন্টারনেট সেবা পেতে পারে, সেই ধরনের সুযোগ তৈরি করে দিতেই এই ভ্যাট হ্রাস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর। তবে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের উপর যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা রয়েছে, তার বদলে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য ভ্যাট হ্রাস করায় গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কতটুকু কমবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই।
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ ভ্যাট হ্রাস হওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে কার্যকরী প্রভাব পড়বে না বলেই মনে করেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) সভাপতি আখতারুজ্জামান মঞ্জু। তিনি বলেন, ‘এর বদলে যদি সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দামের উপর যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে, সেটি কমিয়ে দিলে সরাসরি গ্রাহকের কাছে ইন্টারনেটের দাম কমানো সহজ হত। সেক্ষেত্রে গ্রাহকরা অনেক বেশি লাভবান হত।’
সরাসরি ইন্টারনেটের উপর ভ্যাট না কমানোর সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট ভোক্তা পর্যায়ের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সাঈদ বিলাস বলেন, ‘ইন্টারনেট ছাড়া এখন আর আমাদের একটি দিনও চলে না। আমাদের পড়ালেখা থেকে শুরু করে বিনোদন—সবকিছুই এখন ইন্টারনেটের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যোগাযোগের হাতিয়ারও ইন্টারনেট। আবার সরকার যে ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করতে চায়, তার জন্যও সুলভে ইন্টারনেট সেবার বিকল্প নেই। অথচ সরকার গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের উপর ভ্যাট প্রত্যাহার করছে না, যা সত্যিই খুব দুঃখজনক।’
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ, ইলেক্ট্রনিক্স ও কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাহিদ হাসান মাহমুদ বলেন, ‘ইন্টারনেটকে যতটাসম্ভব সুলভ করা যায়, তত ভালো। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনার কথা আমরা সকলেই জানি। ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাদের সেই সম্ভাবনার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। তাই ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেটের উপর ভ্যাট প্রত্যাহার করা জরুরি। কিন্তু ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে ভ্যাট কমালে সেটা গ্রাহক পর্যায়ে কতটা সুফল বয়ে আনবে, সেই সন্দেহ থেকেই যায়।’
সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি, তাকে ধরে রাখতে হলেও মূল চালিকাশক্তি হলো সুলভে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ। যে কারণে ফ্রিল্যান্সারদের দীর্ঘদিনের দাবিই ছিল ইন্টারনেটের উপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করার। কিন্তু এটি না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন তারাও। মোবাইল অ্যাপস ক্যাটাগরিতে বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত ফ্রিল্যান্সার জিএম তাসনিম আলম বলেন, ‘আমাদের দেশে ইন্টারনেটের খরচ অনেক বেশি। যে কারণে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহীদের শুরুতে অনেক কষ্ট করতে হয়। এই খরচ কমিয়ে দিলে আরও অনেকেই নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনেক ভালো করতে পারত। আর তার জন্য গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের উপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি আমরা অনেকদিন থেকেই জানিয়ে আসছি কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আমরা লক্ষ করিনি। এটা না করতে পারলে আমাদের এগিয়ে যেতে অনেক বেশি সময় লাগবে।’
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই চান ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হোক। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেকেই এই সিদ্ধান্তের সাথে নীতিগতভাবে সম্মত হলেও এটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আর তাতে করে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে বলে মন্তব্য তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্টদের।
