বিজ্ঞানশিক্ষার জন্য যাহা প্রয়োজন

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৬
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব তাহার বুদ্ধিমত্তার কারণে। সেই বুদ্ধিমত্তার শানিতরূপ হইল বিজ্ঞান, যাহার উপর ভিত্তি করিয়া রচিত হইয়াছে এই সভ্যতা। ধরা যাক, গত দুই সহস্র বত্সরে মানুষ তাহার ধীশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাইতে আলস্য দেখাইল। তাহা হইলে আমরা এখনও এমন একটা সময়ে বসবাস করিতাম যখন আকাশের তারকাদের মনে করা হইত ছোট ছোট ফুলকি বা জোনাকি পোকা মাত্র, যাহাকে হাতের তালুতেও রাখা সম্ভব। এই বিশ্বে যেই সকল জাতি যুগে যুগে অন্য জাতিকে শাসন কিংবা শোষণ করিয়াছে, তাহারাও সর্বাগ্রে বলীয়ান ছিল বিজ্ঞানের শক্তিতে। বলা যায়, পার্থিব জগতে বিজ্ঞানের শক্তির তুলনা চলে না আর কোনো কিছুর সহিত। সভ্যতা ও সমাজের অগ্রগতির মুখ্য প্রভাবক হইয়া উঠিয়াছে বিজ্ঞান। যেই রাষ্ট্র বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চায় অগ্রগামী, সেই রাষ্ট্র এমন কোনো দিক নাই যাহাতে তাহাকে পশ্চাত্পদ বলা যাইবে। এমনকি যেই বিজ্ঞানকে কুক্ষিগত করিয়া মানব বিধ্বংসী ভূমিকাও গ্রহণ করা হইয়াছিল বিংশ শতকের মহাযুদ্ধকালে, সেই বিজ্ঞান আজ নীতিগতভাবে সর্বজনীন, সমগ্র মানবজাতির মঙ্গল যেইখানে মিলিয়া মিশিয়া একাকার হইয়া গিয়াছে। এইরূপ গৌরচন্দ্রিকার নেপথ্য কথা হইল, বিজ্ঞান শিক্ষায় আমাদের শিক্ষার্থীরা পূর্বের তুলনায় অনাগ্রহী হইয়া উঠিয়াছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত সংবাদে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের পৃথক চারটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ২০০৯ সালে অষ্টম শ্রেণী হইতে ২০১৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা অবধি পাঁচ বত্সরে বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারাইয়া মূলত বাণিজ্য বিভাগের প্রতি আসক্ত হইয়াছে। বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহের এই চিত্র অস্বাভাবিক নহে এই কারণে যে, সিংহভাগ শিক্ষার্থীরা মুখ্যত বাছিয়া নেয় সেই ধরনের পড়ালেখা যেইখানে চাকুরির বাজার উর্বর। কর্মজীবনের সুবিধা তাহারা যেইখানে অধিকহারে পাইবে ইহার প্রতি তাহারা অধিক আগ্রহী হইবে, তাহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। কেননা, আমাদের দেশের পড়ালেখা ও তাহার প্রায়োগিক দিকসমূহ চাকুরির বাজারকেন্দ্রিক। নিখাদ বিজ্ঞান বিষয়ের পড়াশোনা শেষে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর বিজ্ঞান গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত হয় না এই দেশে। কৃষি বিজ্ঞানের বেশ কিছু প্রণিধানযোগ্য আবিষ্কার এইখানে উল্লেখ করিবার মতো উদাহরণ দেওয়া গেলেও অন্য বিজ্ঞানবিষয়ক, যথা পদার্থ, রসায়ন, জীব কিংবা গণিতের তত্ত্বীয় স্তরে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার মতো প্রতিষ্ঠান আমাদের নাই। সুতরাং এই বিষয়ে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চতর গবেষণা করিতে চাহিলে তাহাকে উন্নত বিশ্বে যাইতেই হইবে। অন্যথায় গতানুগতিক শিক্ষকতা কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রাখিয়া সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে, যেইখানে গবেষণার সুযোগ বা পরিবেশ নাই বলিলেই চলে। অথচ উন্নত বিশ্বে এই চিত্র সম্পূর্ণই ভিন্ন। নীতি নির্ধারণকারী সংস্থাসমূহ নিশ্চয়ই এই বাস্তবচিত্র সম্পর্কে অবহিত। বিজ্ঞান একাডেমি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গত রবিবারও প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন, তিনি নিজে সাহিত্যের ছাত্রী হইলেও বিজ্ঞানের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন গভীরভাবে। সোনার বাংলা গড়িতে হইলে বিজ্ঞানের উপর ব্যাপক গবেষণা ছাড়া উপায় নাই, এই বাস্তবতাও তিনি উচ্চারণ করেন স্পষ্ট করিয়া। দেশে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সরকারের পক্ষ হইতে সবরকমের সহযোগিতার কথাও প্রায়শই শোনা যায় তাঁহার কণ্ঠে। অর্থাত্, বিজ্ঞান শিক্ষা লইয়া তাঁহার সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নাই। শুধু নীতি নির্ধারকদের এই কথা স্মরণ রাখিতে হইবে, কেবল ফলিত বিজ্ঞান বা বাণিজ্যমুখী শিক্ষার কর্মক্ষেত্র নহে, নিখাদ বা তত্ত্বীয় বিজ্ঞানের বিষয়সমূহের উচ্চমানের কর্মপ্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করিতে হইবে। নচেত্ মেধাবীরা কেন নিজেদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলিবে বিজ্ঞান পড়িয়া? শেষ অর্থে জীবনটা তো তাহার ব্যক্তিগত এবং কর্মটিও তাহার নিজেকেই জোগাড় করিতে হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন