সমগ্র বাঙালি জাতি যখন বৈশাখের আনন্দে আত্মহারা তখন সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া চার তরুণের করুণ মৃত্যুর খবর যেন সব আনন্দকে হঠাত্ থামাইয়া দিয়াছে। গণমাধ্যমগুলি বিশেষ গুরুত্বের সহিত এই দুর্ঘটনার চিত্র তুলিয়া ধরিয়াছে। ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতেও ইহা লইয়া ব্যাপক আলোচনা চলিতেছে। অন্যদিকে অকালে চলে যাওয়া ছাত্রদের বাড়িতে চলিতেছে শোকের মাতম। কিন্তু প্রশ্ন হইল, এইদেশের নাগরিকগণ কি কোনো ক্ষেত্রেই নিরাপদ নহে? পত্রিকাগুলিতে প্রতিদিন যেই মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশিত হইতেছে তাহার প্রতিক্রিয়ায় এইরকম প্রশ্নের অবতারণা অস্বাভাবিক নহে। যখন দেশ আগাইয়া যাইতেছে, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি যেইখানে বিশেষ গুরুত্ব পাইবার কথা সেইখানে এই সব লোমহর্ষক ও হূদয়বিদারক ঘটনা যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি চরম উদ্বেগের।
অকালপ্রয়াত আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহরিয়ার ইসলাম নোমানের লাশ দাফন হইবার আগে সংক্ষিপ্ত এক আলোচনায় সমুদ্রে পর্যটনকে নির্বিঘ্ন করা, সতর্কতা বৃদ্ধি, পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদার করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও দায়িত্বশীল হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখিবার দাবি জানানো হইয়াছে। দাবিগুলির যথার্থতা অনস্বীকার্য। বিশ্বব্যাপী যেইসকল সমুদ্র উপকূলে পর্যটন শিল্প গড়িয়া উঠিয়াছে সেইখানে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। সমুদ্রে নির্দিষ্ট সীমানা পর্যন্ত ব্যবস্থা করা হয় একপ্রকার জালের যাহাতে সাঁতার কাটিবার সময় কেউ ভাসিয়া না যায়। তাহাছাড়া সমুদ্র তীরবর্তী সমগ্র এলাকাটিকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে লইয়া আসা হয় যেন কোনো দুর্ঘটনা নজরে আসিলে দ্রুতই পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসাবে বিবেচিত। বিশ্বের প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের মনোনয়ন পাওয়া বড় দুইটি পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থান এইদেশে। এইখানে রহিয়াছে কক্সবাজারের মতো বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত এবং বিশ্বের বৃহত্ উপকূলীয় বন সুন্দরবন। কাজেই পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিকে দিতে হইবে সর্বাধিক গুরুত্ব। ২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্প ২০১২ সালে দেশে প্রায় তিন লক্ষ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করিয়াছে, কিন্তু যেইহারে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়িয়া গিয়াছে তাহাতে বিদেশি-দেশি পর্যটকগণের নিকট ইহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতে পারে। দেশ হারাইতে পারে সম্ভাব্য অতিরিক্ত রাজস্বও।
দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটনকালে দুর্ঘটনা এড়াইতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ইতোমধ্যেই বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা হইয়াছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশে বলা হইয়াছে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি শিক্ষা ভ্রমণে যাইবার আগে স্থানীয় প্রশাসনকে জানাইতে বাধ্য থাকিবে। যেকোনো শিক্ষা ভ্রমণকালে ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সহিত যাইবেন এবং শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিবেন যাহাতে ভ্রমণের সময় সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানো যায়। বড় কোনো শিক্ষা ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানোর কথা বলা হইয়াছে। নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ, কিন্তু প্রশ্ন হইল এই নীতিমালাগুলি কেন আগে জারি করা হইল না? এই রকম ঘটনা কি আগেও বহুবার ঘটে নাই? আর যাহারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেড়াইতে যায় তাহাদের নিরাপত্তার ব্যাপারেই বা সরকারের পদক্ষেপ কী? নির্দেশিত নীতিমালা কি নিয়মিত কার্যকর থাকিবে নাকি দায়িত্বপ্রাপ্তদের উদাসীনতায় এইগুলিও কিছুদিন পর শুধু কাগজেকলমে আবদ্ধ রহিয়া যাইবে, ইহাও দেখিবার বিষয়।
