কাকে বলে গানের মানুষ? যাঁদের গান অন্ত প্রাণ, যাঁরা জাগরণে নিদ্রায় সুখে-দুঃখে গান ছাড়া থাকতে পারেন না তাঁরা? না যারা পেশা জীবিকা বা সখের নেশায় গান করেন তাঁরা? আমি প্রথম ভাগের মানুষ, ছেলেবেলা থেকে কৈশোর অবধি হারমোনিয়াম টিপাটিপি করলেও এক সময় বুঝে গেছি ওটা আমার কর্ম নয়, গান গাইবার মত সুরেলা কণ্ঠ বা রেওয়াজের ধৈর্য নেই আমার। এতে দোষের কিছু নেই। প্রকৃতি বা ঈশ্বর যাই বলি না কেন, তার বিচার আসলেই নিরপেক্ষ। আমাদের সমাজ বা রাজনীতির মত যারে দেয় তারে ‘চাপ্পড় মাইরা দেয়’ গোছের কিছু করে না। বুঝে শুনে সমঝে যাকে যতটুকু দেবার ঠিক ততটুকু দেয় বলেই প্রকৃতির ভারসাম্য ও সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ফলে গান গাওয়া হবে না বুঝলেও গান ছাড়িনি। জীবনে আচরণে পতনে উত্থানে গান আমার নিত্যসঙ্গী। হেন গান নেই যা আমি শুনি না। আজম খান, পল রব সন, জন লেনন, বব মারলি, নচিকেতাকে যেমন ধারণ করি তেমনি বুক জুড়ে আছেন শৈলজা রঞ্জন, সুবিনয়, কনিকা, দেবব্রত কিংবা আমাদের ওয়াহিদুল হক। গানের জাত নেই, ধর্ম নেই, সীমানাও নেই, একবার ক্যানবেরা বেড়াতে গেছি, দীপাকে শপিংমলে ঢুকিয়ে বরাবরের মত আমি মলের বাইরে ফোয়ারা তলে বসে চা পান করছি, অপেক্ষমান সময়কে হঠাত্ ভরিয়ে তুললো এক আশ্চর্য সঙ্গীত মূর্ছনা, অনতিদূরে একদল তরুণ-তরুণী তালে তালে অদ্ভুত সুরে রাঙিয়ে তুলেছিল রাজধানী ক্যানবেরার উজ্জ্বল আকাশ, সে কি সুর! কি অপূর্ব ছন্দ ও তাল। বলিভিয়া কিংবা পেরু যে কোন একটি দেশের ঐ তরুণ-তরুণীদের ল্যাটিন মিউজিকও না বুঝতে পারা গানের বাণী আমার চোখ ভিজিয়ে একাকার করে দিয়েছিল। বাণী যে সব সময় বুঝতে হবে তেমনও কোন কথা নেই। পাড়ার মিলাদ বা দরগাহ শরীফে দাঁড়িয়ে ইয়া নকীর সাথে কতবার যে কেঁদেছি, বুক থেকে অশ্রু চোখের পাতা বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে। বাণী সমস্যা করেনি। সংস্কৃত মন্ত্রে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়া শরতের আকাশ কাঁদিয়ে যায় বাংলায়। গানের এমন প্রভাব, সুরের এমনই ইন্দ্রজালিক ক্ষমতা, তারপরও নিজস্ব গান বা গানের জগত্ বলে একটা কথা আছে। পৃথিবীর সব মা যেমন নিষ্পাপ, বা পবিত্র, তারপরও আমার জননীই আমার মা, তেমন ধারা আমাদের গান আমাদের জগত্ বাংলাদেশের গর্ব ও উেসর শেকড়। লালন ফকির রবীন্দ্র নজরুল পঞ্চ কবির গান আমাদের হলেও একার কিছু নয়, উভয়বঙ্গের সমান অধিকার আছে এতে। একেবারে একান্ত যে জগিট তা সাতচল্লিশের পর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও শাসকদের বিরোধিতার পরও নিজেই পথ খুঁজে নিয়েছিল, ভাটি বাংলার গান যে শুধু গান নয়, সে মানুষের প্রাণও বটে। জন্ম উত্সব বিবাহ, গায়ে হলুদ এমন কি ছন্দে বানানো, ফসল কাটা থেকে মৃত্যু অবধি তার কণ্ঠে সুর আর গান, এই জনপদের মানুষ গান ছাড়া বাঁচতে জানে না, ফলে নদীর প্রবাহে, দিনের আলোয় সূর্যাস্তের রং, প্রকৃতির নিয়মে গানের জগত্ গড়ে উঠল পদ্মা তীরে। আমাদের ছায়া ছবি নাটক রেডিও বা ঘরোয়া আয়োজনে সুরের নতুন ধারায় নতুন বাণীতে তৈরি হয়েছিল এক নব আবহ। সে গানের ভীড়ে জ্বলজ্বল করছে। ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়;’ চমকে ওঠার মত বিরহী কণ্ঠ। তখনকার আমলে সিডি, কম্পিউটার বা মোবাইলের চল ছিল না। আবিষ্কৃতও হয়নি। তারপরও সাধারণ রেডিও আর মানুষের কণ্ঠে ভর দিয়ে সারা বাংলাদেশ জয় করে নিয়েছিল ময়নামতীর এই গান। ময়নার জন্যে মতির এই দরদে বাংলা জয় করে নিলেন বশির আহমদ। এই গানটি কিছুটা ফোক প্রকৃতির, এর সাথে ঔদার্য ও পল্লীগীতির যোগ আছে। নাগরিক বাঙালি কিছুটা ভ্রূ কোঁচকাতেই পারতো। কিন্তু বশির আহমদ এসেছিলেন মাতাতে, জয় করতে। রাজ্জাকের কণ্ঠে ‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো’ ঠিক যেন দ্বিতীয় উত্তম কুমার, বশির আহমদের সুললিত কণ্ঠের এই গান রাজ্জাকের সে ভাবমূর্তি ছড়িয়ে দিল মধ্যবিত্তের মনোজগতে। এরপর ‘ডেকো না আমারে তুমি পিছু ডেকো না’ ‘কাঁকন কার বাজে রুম ঝুম’ এ জাতীয় ক্লাসিক গানে আমাদের সঙ্গীত জগতের ধ্রুবতারা হয়ে উঠলেন বশির আহমদ। বাংলা গানের সুবর্ণ অধ্যায় যে কেবল ঐ বঙ্গে রচিত হয়েছিল এমন কিন্তু নয়। আজ যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তত্কালীন পূর্ববঙ্গ অর্থাত্ আজকের বাংলাদেশও এগিয়ে চলেছিল, আকাশ বাণী, হিজ মাষ্টার্স ভয়েস বা মিডিয়া না থাকার কারণে অতটা প্রচার পাইনি আমরা। সে যুগের অন্যতম নক্ষত্র বশির আহমদ বিদায় নিয়েছেন অতিসম্প্রতি। ধ্রুপদী যুগের গায়ক বশির আহমদকে আজকের তথাকথিত ষ্টাররা চেনে কিনা জানি না। না চিনলে তাঁর কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি নেই। তিনি এদের মত হঠাত্ উদিত হয়ে অকস্মাত্ ঝরে পড়ার জন্যে গান করেননি। হারমোনিয়াম, বাঁশী ও তবলার শুরু জগতের চিরস্থায়ী নক্ষত্র বশির আহমদ। তাঁর কণ্ঠ যন্ত্র দিয়ে ঠিক করা হতো না, বাদ্যযন্ত্রে ঢেকে দেয়া হতো না এঁদের বাণী ও সুর। আজকের তারুণ্যকে বলি গান গাওয়ার আগে চ্যানেলে চ্যানেলে ইঁদুর দৌড়ে দৌড়ে মরার আগে গান শোন। আমাদের মত অনেকেই গান গাইতে পারতো, গায়নি। কারণ আমরা জানতাম কোনটা হবে আর কোনটা হবার নয়। এই যে সম্ভাবনা ও দুর্ভাবনার তফাত্, এটা ঘুচে গেলে শিল্প আর শিল্প থাকে না। বাংলাদেশ গানের দেশ গানের শেকড় হবার পরও আজ তার অবক্ষয় ও বিপর্যয় এড়িয়ে যাবার মত নয়। এমন দুঃসময়ে বশির আহমদের প্রস্থান বেদনার যেমন তেমনি ভয়েরও। একে একে নিভিছে দেউটি। বাঙালি না হবার পরও বাংলা গানের জগত্ এমনভাবে ভরিয়ে দেয়া মনেপ্রাণে বাঙালি হয়ে ওঠা—এই শিল্পীকে জানাই শেষ শ্রদ্ধা।
(সিডনি থেকে)
