২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বুধবার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক দুঃখজনক ঘটনার মিছিলে আর একটি ঘটনার দৃষ্টান্ত ‘রানা প্লাজা’। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, বৃহস্পতিবার ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের দুঃখজনক সূচনা। আমি ছিলাম শিক্ষাজীবনের প্রথম পদক্ষেপ মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে। আমার সামনে একদিকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আর অন্যদিকে শিক্ষাজীবনের প্রথম দেয়াল অতিক্রমের পরীক্ষা। আমি সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করিনি, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার। সামনে ছিল স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে দেশের আপামর মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত ও এর মাধ্যমে অথনৈতিক মুক্তি, যার প্রতীক হচ্ছে জাতীয় পতাকা এবং সংগীত। আজ ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস, দীর্ঘ ৪৩ বছর হতে চলেছে। এখনও দেশের ১৬ কোটি মানুষের একটি বড় অংশ মানবেতর জীবন-যাপন করছে। জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া জোয়ানদেরও একটি অংশ খাদ্য, চিকিত্সা, বাসস্থানের সমস্যার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। যে দেশের মুক্তিযোদ্ধারা কষ্টে জীবনযাপন করে, সে দেশের মানুষের একটি অংশের মানবেতর জীবন খুবই স্বাভাবিক। রানা প্লাজার বর্ষপূর্তিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশের প্রায় সব সংবাদপত্রের প্রধান সংবাদ ‘রানা প্লাজা’ ক্ষতিগ্রস্তদের বর্তমান জীবন ব্যবস্থা কেমন তা নিয়ে। সরকারি হিসাবে ১ হাজার একশ ৩৫ জনের প্রাণহানি এবং আহত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে ২ হাজার কর্মচারীর পরিবার। অনেকের মতে, আমাদের ১৬ কোটি মানুষের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাত্ প্রায় ৫ কোটির বেশি মানুষের পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য ক্রয়ের ক্ষমতা নেই। আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ এই বিষয়টি কীভাবে দেখেন বা চিন্তা করেন তা বুঝি না। তবে এটুকু বুঝি যে, ‘রানা প্লাজা’য় কর্মরত ছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মচারী যাদের পরিবারের সদস্যরা ঐ ৫ কোটিকে সমৃদ্ধ করেছে, বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করতে না পারলেও।
সমাজের কর্তাব্যক্তিরা আমার সাথে একমত হবে কিনা জানি না। তবে আমার স্থির বিশ্বাস, ১৯৭১ সালের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্যে যাদের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিল সেসব পিতার সন্তানদের একটি অংশ বর্তমানে ভাল আছে নিজের চেষ্টায়। দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। বিদেশি অনেক দেশের অফিস অর্থাত্ দূতাবাস হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রচলন বেড়েছে। দেশের মানুষের একটি অংশের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, আমদানি বেড়েছে; এমনকি আদা, কাঁচা মরিচও যুক্ত হয়েছে আমদানি পণ্যে। সরকারের বাজেটের আকার বেড়েছে। মন্দ লোকেদের ভাষায় দুর্নীতিও বেড়েছে। এতসব বৃদ্ধির সাথে সাথে গরিব মানুষের সংখ্যাও যে বেড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আনন্দের সংবাদ হচ্ছে খাদ্যাভাবে কেউ মারা যায় না।
স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন। সরকারের উন্নয়নের জন্যে একটি টার্গেট থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি দেশের অধিকাংশ মানুষের মঙ্গল ছাড়া সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যে কোন্ কাজটি আগে করতে হবে সেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার সার্বিক বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দরিদ্রতার হার/সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা আছে, দেশের সবাইকে ২০১৪ সালের মধ্যে শিক্ষিত করার পরিকল্পনাও আছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাজেট বরাদ্দ যথাসময়ে হয়েও থাকে। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে আমরা বলতে পারছি না দেশের কতজনকে শিক্ষিত করতে পেরেছি। ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিলেই দরিদ্রতা যদি দূর হতো তাহলে ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ এর মত মহাপরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল না। বাজেট বরাদ্দ করলেই সুফল পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে দীর্ঘদিন যাবত্ পরিচালিত ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ প্রমাণ করে টাকা ব্যয় করলেই লক্ষ্য অর্জন হয় না।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা যায়, গরিব দিন দিন গরিব হচ্ছে, কিছু মধ্যম আয়ের মানুষও নিম্ন মধ্যবিত্ত বা সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মাঝে মাঝে মনে হয়, দেশে কোন সরকার নেই বা কেউ সরকারকে মানছে না। ফলে সমাজে দরিদ্র, দুর্বল সুবিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। আমাদের সংবিধানের জন্যে অনেকেই অনেক কথা বলেন, কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের জন্যে সংবিধানে যে সুযোগ-সুবিধার কথা বলা আছে তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় কথা কেউ বলেন না বা দেখার কেউ আছেন বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের সংবিধানে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিত্সা, শিক্ষা এবং বস্ত্রের নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ আছে। দেশে মানুষকে চাহিদার দিক দিয়ে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একদল যাদের নিজস্ব আর্থিক উপার্জনে তা সংস্থান সম্ভব আর একদল যাদের জন্যে সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন আছে কমবেশি। এক্ষেত্রে সরকার যদি তার দায়িত্ব সততার সাথে পালন না করে তাহলেই সমাজের বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে বা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। যেমন সমাজের একদল আছে যাদের খাদ্য, চিকিত্সা এবং শিক্ষার জন্যে সরকারি সাহায্যের প্রয়োজন। সরকার যদি কোন না কোনভাবে এই দায়িত্ব পালন না করে তাহলে ঐ দরিদ্র জনগোষ্ঠী কোন অবস্থায় দারিদ্র্যের বিষচক্র থেকে বের হতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত জনগোষ্ঠীর কাছে সবার আগে প্রয়োজন খাদ্য। খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ‘রানা প্লাজা’র মত শত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনও তাদেরকে আটকাতে পারবে না জীবন বাজি রাখতে। তার উদাহরণ দেয়া যায় ট্রলারে চড়ে চাকরির সন্ধানে বিদেশ গমনের চেষ্টা। ২৫ বছরের যুবকের কাছে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী, সংসার অপেক্ষা বিদেশে চাকরির জন্যে বছরের পর বছর থাকার প্রয়োজন বেশি। অবশ্যই তা শখের বশে নয়, প্রয়োজনের তাগিদে।
দেশের অধিকাংশ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নতির জন্যে প্রয়োজন দরিদ্রতার বিষচক্র ভাঙ্গা। মানুষের আয় কম হলে সঞ্চয় কম হবে আর সঞ্চয় কম থাকলে বিনিয়োগ কম করতে পারবে। আর বিনিয়োগ কম হওয়ায় আয় কম হবে। একই চক্র। এই চক্রকে ভেদ করতে হবে। দেশে যেহেতু বিত্তবানের সংখ্যা কম, সে কারণে বলা যায় পরোক্ষ করের মালিক দেশের গরিব, যারা সংখ্যায় অধিক। সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সমাজের বৈষম্য দূর করার পদক্ষেপ নিতে আর বেশি সময় নষ্ট করা হলে জাতীয় পর্যায়ে তা হবে আত্মঘাতী। আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করার মাধ্যমেই শুধু সুন্দর ভবিষ্যত্ আশা করা যায়। চিন্তা করা সম্ভব হবে যে ‘রানা প্লাজা’ ধসের মাধ্যমে আর কোন ২০ বছরের যুবতী পঙ্গু রেহেনা বলছে না—‘আমাকে কেউ চাকরি দিচ্ছে না, এমনকি আমাকে কেউ বিয়েও করছে না।’ আমাদের অর্থনীতি আমাদেরকেই ঠিক রাখতে হবে, বিদেশি সাহায্য কোনদিনও দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা দিতে পারে না। বিদেশিরা এদেশে ব্যবসা করতে এসে আমাদের গরিবদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করবে-তা ভাবনা পর্যন্তই রাখা উচিত। বিদেশি বন্ধুদের সহানুভূতি সম্মান করার অনেক পথ আছে। বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে অন্যকে কষ্ট না দিয়ে নিজের ভাল করা। সময়ের মূল্য দেয়া।
লেখক: এফসিএ
[email protected]
