স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ নাসিম এক আলোচনা সভায় একটি গুরুতর প্রশ্ন তুলিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, ‘আমরা কোন সমাজে বাস করিতেছি? পুলিশ কর্মকর্তার উস্কানিতে রোগীর আত্মীয়রা ডাক্তারকে মারিতেছে। ডাক্তার সাংবাদিকদের মারিতেছে।’ সমপ্রতি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং বারডেম হাসপাতালে সংঘটিত অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি এই মন্তব্য করেন। ঘটনার বিবরণে আমরা দেখিতে পাই, বারডেম হাসপাতালে কথিত চিকিত্সা অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা হাসপাতাল ও ডাক্তারদের ওপর হামলা করেন। ইহার প্রতিবাদে চিকিত্সকরা কর্মবিরতিসহ কঠোর আন্দোলনে নামেন। অন্যদিকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড এবং রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নি ডাক্তাররা কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা করেন। ইহার প্রতিক্রিয়ায় উল্লিখিত হাসপাতালসমূহে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি চরম আকার ধরাণ করে। আবার একই সঙ্গে দুইটি মহান পেশার লোকজনদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক ও চিকিত্সক নেতৃবৃন্দের মধ্যে সফল আলোচনা হইয়াছে। ফলে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে।
সাংবাদিকদের ওপর ইন্টার্নি বা শিক্ষানবিস ডাক্তাররা হামলা করিয়াছেন, সাধারণত সচরাচর এই ঘটনা ঘটে না। ইহাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখাই ভাল। তবে আমাদের দেশে বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাইতেছে যে, সামান্য কারণেও আজকাল রোগীর বিক্ষুব্ধ আত্মীয়-স্বজন সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও ডাক্তার-নার্সদের ওপর চড়াও হইতেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহার শিকার হইতেছে বেসরকারি চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানগুলি। আমাদের দেশে চিকিত্সা ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার কারণে এইরূপ অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হইতে পারে। বিষয়টি গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা দরকার এবং ইহার অন্তর্নিহিত কারণ উদ্ঘাটনে দরকার গবেষণা। ইহার কারণ হইতে পারে চিকিত্সা ব্যবস্থা ও চিকিত্সকদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের এক প্রকার আস্থাহীনতা। সরকারি ও বেসরকারি উভয় চিকিত্সা ব্যবস্থার আসল গলদ কোথায় তাহা নিয়া চিন্তা-ভাবনা করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত এরূপ অসহিষ্ণুতার পশ্চাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাও অবচেতন মনে কাজ করিতে পারে। তবে এত হতাশা সত্ত্বেও আমরা একটি ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করিতেছি। তাহা হইল মানুষ ক্রমান্বয়ে অধিকার সচেতন হইতেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিতে শিখিতেছে। প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতি নিয়া প্রশ্ন থাকিলেও প্রতিবাদী চেতনাকে আমাদের সম্মান না জানাইয়া কোন উপায় নাই।
অনেক সময় যে কারণে কোন রোগীর মৃত্যু হয় তাহার গভীরে না গিয়াই বা স্রেফ গুজবে কান দিয়া নির্বিচারে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও কর্মরত ডাক্তার-নার্সদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটিতে দেখা যায়। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক । আসলে ভুল চিকিত্সা বা চিকিত্সকদের অবহেলা বহুক্ষেত্রে একটি আপেক্ষিক বিষয়। ইহা ডাক্তার ভেদে ভিন্ন রূপ লাভ করিতে পারে। যাহাতে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও তাহার আত্মীয়-স্বজনরা ইহার প্রতিকার পান সেইজন্য প্রয়োজনীয় আইন ও উচ্চতর চিকিত্সা সংক্রান্ত অনুসন্ধানের ব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের সেই রকম ব্যবস্থা নাই। এই কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাইতেছেন যদিও সেই প্রতিবাদের ভাষা ভাঙ্চুর বা হামলা হইতে পারে না। ইহার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করিয়া অন্যের চিকিত্সা পাইবার অধিকারকেই বরং খর্ব করা হয়। অন্যদিকে ডাক্তার-নার্সরাও এই সমাজেরই অংশ। কোন কারণে তাহারাও সংক্ষুব্ধ হইতে পারেন। অক্সিজেন না পাওয়ার কারণে যদি কোন রোগীর মৃত্যু হয়, তাহা হইলে ইহার জন্য ডাক্তারদের দায়ী করা চলে না। ইহা ব্যবস্থাপনার সংকট। সমপ্রতি রাজশাহীর আরেক ঘটনায় উদভূত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠিয়া পেশাগত কারণে উত্তরাঞ্চলের চিকিত্সকদের এক কাতারে দাঁড়াইতে দেখা গিয়াছে। বারডেম হাসপাতালেও ডাক্তার-নার্সদের সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত প্রতিবাদ কর্মসূচি আমরা লক্ষ করিলাম। বস্তুত দলবল ও পেশিশক্তি থাকিলে অন্যের ওপর হামলা চালানো যাইতেই পারে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, যাহারা হামলার শিকার হন তাহাদেরও তো দলবল বা সংগঠন থাকিতে পারে। এইভাবে সকলেই যখন অধিকার সচেতন হইবেন ও নিজ নিজ পেশায় ঐক্যবদ্ধ থাকিয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন হইবেন, তখনই সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হইবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আজিকার নূতন প্রজন্মকে যুক্তিসংগত কারণে প্রতিবাদী হইতে দেখিয়াও আমরা আশান্বিত।
