সত্যজিত্ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রে হাল্লার রাজা হঠাত্ হঠাত্ যুদ্ধংদেহী হইয়া উঠিতেন। নিপাট ভালো মানুষটি বিশেষ রসায়নের প্রতিক্রিয়ায় পুরো একশত আশি ডিগ্রি ঘুুরিয়া ‘যুদ্ধ, যুদ্ধ’ বলিয়া চিত্কার জুড়িয়া দিতেন। হাল্লা রাজার এই যুদ্ধংদেহী তেজ তৈরি হইত বিশেষ ঔষধের প্রতিক্রিয়ায়। তাহা ছিল একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। উপেন্দ্রকিশোরের এহেন রূপকথার রাজার বংশধরেরা কি বাস্তবেও রহিয়াছে? থাকিতেও পারে। কেননা, পত্রিকান্তরে জানা যায়—নরসিংদীর রায়পুরা নীলক্ষার চরাঞ্চলে এখন ঘোষণা দিয়া শুরু হইতেছে টেঁটাযুদ্ধ। প্রতিপক্ষকে আমন্ত্রণ জানাইয়াই হাজার হাজার লোক লিপ্ত হইতেছে ভয়ানক টেঁটাযুদ্ধে। প্রতিপক্ষের ছোঁড়া টেঁটাবিদ্ধ হইয়া প্রায়শই আহত এমন কী মৃত্যুর কোলেও ঢলিয়া পড়িতেছে নারী-পুরুষ ও শিশুসহ স্থানীয় টেঁটাযোদ্ধারা। অব্যাহত সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় গত রবিবার নবমবারের মতো টেঁটাযুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে। নীলক্ষারচরের গ্রামগুলি পরিণত হইতেছে বিরাণভূমিতে। অথচ ধরাছোঁয়ার বাহিরেই রহিয়া যাইতেছে টেঁটাযুদ্ধের নাটের গুরুরা। রক্তের এই হোলি খেলা বন্ধ করিবার কার্যকরী কোনো উদ্যোগ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও গ্রহণ করিতে পারিতেছে না। তাহারা যেন এই যুদ্ধের নীরব দর্শক! সর্বশেষ মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে যেই ৯ দফা টেঁটাযুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, তাহাতে আহত হইয়াছেন অন্তত দেড়শত ব্যক্তি। ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের ঘটনার ইয়ত্তা নাই। লুটপাট ও চাঁদাবাজি হইয়াছে কয়েক কোটি টাকার মালামাল। রায়পুরা থানায় মামলা-পাল্টা মামলা হইয়াছে অন্তত ১০টি। কয়েক হাজার মানুষকে এইসব মামলায় আসামি করা হইয়াছে। এমনও অভিযোগ রহিয়াছে যে, পুলিশের উপস্থিতিতেই বার বার টেঁটা যুদ্ধের ঘটনা ঘটিলেও পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তায় দুই পক্ষকে টেঁটা যুদ্ধে বারংবার উসকাইয়া দিতেছে।
কৃষি ও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই এই চরাঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু কী এমন দুষ্টবীজ হাল্লা রাজার মতো তাহাদের রক্তে প্রোথিত হইয়া গিয়াছে যে, পান থেকে চুন খসিবার মতো সামান্য কারণেই তাহারা টেঁটা লইয়া প্রতিপক্ষের প্রতি মরণযুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িতে ব্যগ্র হইয়া উঠে? তাহাদের এই মানসিকতা যেন আত্মঘাতী স্বভাবদোষে পরিণত হইয়াছে। যেই যুদ্ধবাজ কর্মকাণ্ড তাহারা যুগ যুগ ধরিয়া প্রদর্শন করিয়া আসিতেছে, তাহা হইয়া উঠিয়াছে সমগ্র এলাকাবাসীর জন্য এক মহাঅভিশাপ! কতিপয় গ্রাম্য মাতব্বর ও স্বার্থান্বেষী দাঙ্গাবাজরা কি ইহা ভাবিবার ফুসরত্ পান না যে, তাহাদের ইন্ধনে সৃষ্ট এহেন সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটিতেছে যাহাদের, পঙ্গুত্ববরণ কিংবা অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হইতেছেন যাহারা, এবং তাহার ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার যে ভয়াবহ দুর্বিপাকে পড়ে—তাহা সর্বার্থেই মানবতা হরণের সামিল। আমাদের রহিয়াছে এক গৌরবোজ্জ্বল সৌহার্দ্যের পল্লী ইতিহাস। পল্লীসমাজের মানুষেরা যুগের পর যুগ ধরিয়া পাশাপাশি বসবাস করিয়া আসিতেছে, একে-অন্যের বিপদে-আপদে হিতার্থে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে। কদাচিত্ নিজেদের ভেতরে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হইলেও তাহা উস্কাইয়া না দিয়া স্তিমিত করিবার পরিমিতবোধ সম্পন্ন গুণী মানুষেরও অভাব ছিল না। এখনও অধিকাংশ পল্লী অঞ্চলে সেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আমরা দেখিতে পাই। নরসিংদীর রায়পুরা নীলক্ষার চরাঞ্চলের প্রভাবশালীদের উপলব্ধি করিতে হইবে—যুদ্ধ বা ধ্বংসে কোনো কৃতিত্ব নাই। শান্তি, সহাবস্থান এবং সহিষ্ণুতা ছাড়া ‘মনুষ্য’ পদবাচ্যে উন্নীত হওয়া যায় না।
