রাজপথে বিএনপির সরকারবিরোধী কর্মসূচি না থাকলেও সরকারের সঙ্গে কথার লড়াই ভালোই চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। বিভিন্ন উপলক্ষে বিএনপির নেতারা বক্তৃতা করছেন এবং কথার এমন তুবড়ি ফোটাচ্ছেন যাতে মনে হচ্ছে, বাগযুদ্ধেই তারা যেন সরকারের পতন ঘটিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করবেন। বিএনপি নেতারা যেসব কথা বলছেন সংক্ষেপে তা হচ্ছে : দেশে বর্তমানে গণতন্ত্র নেই। স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় আছে। এই সরকারকে দ্রুত বিদায় না করতে পারলে দেশের ঘোর অমঙ্গল। তবে তারা এটা বলতে পারছেন না যে, কীভাবে বা কী উপায়ে—তাদের ভাষায়—বর্তমান ‘অবৈধ’ সরকারকে হটিয়ে দেশে সত্যিকার গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। তারা কি গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করবেন? নাকি গণআন্দোলন বা ‘বিপ্লব’ ঘটিয়ে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করবেন? যদি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তন তাদের লক্ষ্য হয় তাহলে সেই নির্বাচন কবে, কোন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে? এসব প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত জবাব বিএনপি নেতাদের বক্তৃতায় পাওয়া না গেলেও রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করে তোলার মতো শব্দবোমা যথেষ্ট পরিমাণেই নিক্ষিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে।
গত ১৯ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলেছেন, যা থেকে কারো মনে হতে পারে যে সরকারের বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই বোধহয় বিএনপি রাজনৈতিক সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছতে চাইছে। বেগম জিয়া বলেছেন, ‘আপনারা অনেক ভুল ও অপরাধ করেছেন। আসুন, একসঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করি। আমরা কেউ কারো শত্রু নই। অতীতেও আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেছি। তাহলে এখন কেন পারবো না? আসুন, দেশে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করি। আমরা দেশকে স্বাধীন করেছি। সবাই মিলে দেশকে গড়তে চাই। এ দেশ সম্ভাবনার। যদি সত্যি আপনারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আসুন একত্রে কাজ করি। দেশ গড়ার কাজে আপনারাও আসুন, আমাদের আপত্তি নেই।’
বিএনপি নেত্রীর বক্তব্যের এই অংশটুকু শুনলে বা পড়লে যে কেউ উল্লসিত হয়ে উঠবেন এই ভেবে যে, বেগম জিয়ার বুঝি বোধোদয় হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও বুঝি পরিবর্তন আসছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন সংঘাতের পথে নয়, সমঝোতার পথেই হাঁটতে হবে। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দুই বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকলে দেশের ভালো হবে না, দেশের মানুষেরও কল্যাণ হবে না। বেগম জিয়ার কথাগুলো অনেক মানুষের অন্তরের কথা। সাধারণ মানুষ তো বুঝতে পারে না, কেন দুই দল আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারে না? জটিলতাটা কোথায়? বেগম জিয়ার বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে, তারা পরস্পর শত্রু নয়। তাহলে? কোথাও না কোথাও তো একটা জট রয়েছে যা বেগম জিয়া বলছেন না। যা বলছেন তা কতটুকু আন্তরিক সে প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক। এগুলো কি তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথা? নাকি শুধু বলার জন্যই বলা? তার বক্তব্য অনুযায়ী বর্তমান সরকার অনেক ভুল ও অপরাধ করেছে। তারপরও তিনি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চান। এখানে বেগম জিয়া যদি বলতেন, ভুল ও অপরাধ আপনারাও করেছেন। আমরাও কোনো ভুল বা অপরাধ করিনি, তাও নয়। কিন্তু আসুন এখন পারস্পরিক দোষারোপের অবসান ঘটিয়ে আমরা নতুনভাবে শুরু করি। তাহলে মানুষের কাছে বেগম জিয়ার বক্তব্য অধিক আন্তরিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হতো। তিনি শুধু সরকারের ‘ভুল ও অপরাধ’ই দেখলেন। নিজেদেরগুলো দেখলেন না। একচোখে দেখলে কি পুরোটা দেখা যায়?
বেগম জিয়া বলেছেন, ‘আমরা কেউ কারো শত্রু নই। ...আসুন দেশে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করি।’ অতি চমত্কার কথা। এমন সুবচন তো দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের রাজনীতি থেকে নির্বাসিত। নিকটঅতীতে বেগম জিয়ার মুখ থেকে সত্যি এ ধরনের কথা শোনা যায়নি। ‘আমরা কেউ কারো শত্রু নই’ বেগম জিয়ার মুখ থেকে উচ্চারিত এই বাক্যটি যদি তার অন্তর থেকে উচ্চারিত হয়ে থাকে তাহলে তো আমাদের দেশের রাজনীতিতে যে গভীর সঙ্কট, যে অচলাবস্থা চলছে তা রাতারাতি দূর হয়ে যাওয়ার কথা। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগকে শত্রু মনে না করে তাহলে তো আর কোনো সমস্যাই থাকে না। কিন্তু আসলে কি তাই? বেগম জিয়া কি মন থেকে চান ‘দেশে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি’ করতে? যদি তাই চান তাহলে ওই একই বক্তৃতায় তিনি কেন বললেন, ‘সীমান্ত পাড়ি দেয়া ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোনো অবদান নেই।’ বেগম জিয়া একই সঙ্গে দাবি করেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সত্যিকার দল হলো বিএনপি’। অথচ প্রকৃত সত্য হলো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিএনপি নামক দলটির অস্তিত্বই ছিল না। বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সত্যিকার দল বলে দাবি করা তো রামের জন্মের আগে রামায়ণ লেখার মতো ব্যাপার হয়ে যায়। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেয়া হয় যে, আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মী অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, তাহলেও এটা মিথ্যা প্রমাণ করা যাবে না যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করে বেগম জিয়া কীভাবে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন? এ ধরনের অনর্থক বিতর্ক তিক্ততা বাড়াবে বৈ কমাবে না। মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবদান অস্বীকার করবেন, আর আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান করতে চাইবেন এটা কী করে সম্ভব?
এক সময় অনেকেই বেগম জিয়ার বাক-সংযমের প্রশংসা করতেন। প্রকাশ্য সভা-সমাবেশের বক্তৃতায় তিনি আক্রমণাত্মক কথা কম বলতেন বলেও কারো কারো মুখে শোনা যায়। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে, বেগম জিয়াও রূঢ় ভাষণে পটু হয়ে উঠেছেন। বেগম জিয়া প্রায় সব সভা-সমাবেশেই দীর্ঘ বক্তৃতা করছেন এবং এক মুখে নানা কথা বলছেন। বক্তব্যে যুক্তি-কুযুক্তি সবই থাকছে। তার কোন কথার কোন মানে সেটা বুঝে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শ্রমিক দলের সমাবেশেও তিনি অনেক কথা বলেছেন। তার বক্তৃতার যে অংশটুকু আগে উদ্ধৃত করেছি সেটুকু থেকে মনে হয় তিনি সমঝোতার পক্ষে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আলাপ-আলোচনার পক্ষে। আবার একই সমাবেশে সরকারের প্রতি হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যতই সংবিধান দেখান এবং এরশাদকে নিয়ে আজীবন ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্র করেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই—এই ‘অবৈধ’ সরকার বেশি দিন থাকবে না, আপনাদের হাতে সময় কম। বিদায় নিতেই হবে। জনগণ এ সরকারকে বিদায় করতে প্রস্তুত। শুধু বিদায় নয়, বিদায়ের পর জনগণের কাছে তাদের হিসাব-নিকাশও দিতে হবে। মানুষ অপরাধের হিসাব দেয় পরকালে আল্লাহর কাছে কিন্তু এই সরকারকে জনগণের কাছেই জবাব দিতে হবে। তারা কোথায় কী করছে, কোথায় টেন্ডারবাজি করছে, কোথায় টাকা-পয়সা সরাচ্ছে, সবকিছুর তথ্য আছে। বিদায়ের পর তারা এসব অভিযোগ খণ্ডাতে পারবে না।’
বেগম জিয়ার পুরো বক্তব্যের মধ্যে যে স্ববিরোধিতা রয়েছে, রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে তিনি যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছেন, সেটা পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। একদিকে তিনি সবাই মিলে দেশকে গড়তে চাইছেন, সরকারের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে চাইছেন আবার বলছেন, সরকারের হাতে সময় নেই, বিদায় নিতেই হবে। বর্তমান সরকার যদি বেশি দিন ক্ষমতায় টিকতেই না পারে তাহলে তো আর দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বর্তমান সরকার বিদায় নেবে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। দেশের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষের আর কোনো দুঃখ-দুর্ভোগ থাকবে না। কেউ না খেয়ে থাকবে না। বিনা চিকিত্সায় কারো প্রাণ যাবে না। বেকার সমস্যা বলে কিছু থাকবে না। সব অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটবে। বিদ্যুতের সমস্যা থাকবে না। রাজধানীতে যানজট থাকবে না। পানি নিয়ে হাহাকার করতে হবে না। গুম-অপহরণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ আর সংঘটিত হবে না। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। ঘুষ-দুর্নীতি হয়ে যাবে অতীতের বিষয়। তিস্তা নদী দিয়ে পানি আসতে থাকবে তরতর করে। কিন্তু সত্যি কি তাই? দেশবাসীকে তেমন সুদিনের স্বপ্ন কি বেগম জিয়া দেখাতে পারছেন? বর্তমান সরকার যদি যে কোনো প্রকারে ক্ষমতায় থাকতে চায়, তাহলে বিএনপি চাইছে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় যেতে। বর্তমান সরকার বেশি দিন যদি ক্ষমতায় টিকতে না পারে তাহলে বিএনপির এত অস্থিরতা কেন? কেন তাদের তর সইছে না? আবার কেনই বা বেগম জিয়া আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলছেন। কেন বলছেন, আমরা কেউ কারো শত্রু নই? দেশকে যারা লুটপাটের রাজ্যে পরিণত করেছে, যারা গণতন্ত্র হরণ করেছে, যারা একদলীয় শাসন কায়েম করছে বলে বিএনপি নেতারা বিরামহীনভাবে প্রচার করে চলেছেন, তারা তো বিএনপির রাজনৈতিক শত্রু হওয়ারই কথা? বেগম জিয়ার কোন কথাটা দেশের মানুষ সত্য বলে ধরবে?
এ সরকার আর বেশি দিন টিকতে পারবে না বলে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে একজন পাঠকের প্রতিক্রিয়া, ‘আমারও তাই মনে হয়। কিন্তু আপনাদের আন্দোলনের যে লেজে-গোবরে অবস্থা আগামী ৪২ বছরেও ওনাদের কিছু করতে পারবেন না।’ শ্রমিক দলের সমাবেশে সরকারের সমালোচনা করে দেয়া বেগম জিয়ার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আরেকজন পাঠকের অভিমত, ‘এখন কী কী অন্যায় হচ্ছে আর আপনারা ক্ষমতায় গেলে কী কী পরিবর্তন হবে, সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাই। শুধু গণতন্ত্রের ধুয়া তুলে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। হিসাব-কিতাবের বাইরে কেউ নয়।’ সত্যি তো, বেগম জিয়া ক্ষমতায় গেলে কী গুম-খুন, অপহরণ বন্ধ হবে? সে নিশ্চয়তা কী তিনি দিচ্ছেন? চট্টগ্রামের বিএনপি নেতা জামালউদ্দিন অপহরণ হয়েছিলেন কোন আমলে? কারা তাকে অপহরণ করেছিল? কী ঘটেছিল তার ভাগ্যে? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কি বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আর হবে না? তেমন নিশ্চয়তা কি তিনি দিচ্ছেন? অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছিল কখন? র্যাব চালু হয়েছিল কোন শাসনামলে? ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার গল্প মানুষ বেশি শুনেছিল কোন সময়ে?
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটির আয়োজনে এক সেমিনারে কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান লর্ড অ্যাভবেরির একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে আজকের মতো শেষ করছি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে লর্ড অ্যাভবেরি বলেছেন, ‘বিরোধী দলের বর্জন ও সহিংসতাপীড়িত নির্বাচনে সংসদের অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া এবং ভোটারদের কম উপস্থিতি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কিন্তু অতীতের দোষারোপের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে ভবিষ্যত্ নিয়ে একটি সমঝোতার প্রয়োজন। নির্বাচনকালীন প্রশাসন কী হবে, তা কে পরিচালনা করবে—এসব বিষয় সমঝোতা ছাড়া নতুন নির্বাচনের আলোচনায় কোনো সমাধান নেই।’
আমাদের রাজনীতিতে দোষারোপের বৃত্ত থেকে কোনো পক্ষের বেরিয়ে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি?
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]
