একসময় শিক্ষা সমাজের কিছু ভাগ্যবান ব্যক্তির জন্যই সংরক্ষিত ছিল। ধারণা ছিল পৃথিবীতে কিছু ব্রাহ্মণ শ্রেণির মানুষকে ঈশ্বর পাঠিয়েছেন তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্র শাসন করার জন্য আর সমাজের অন্যান্য সাধারণের জন্মই হয়েছে শুধু ব্রাহ্মণ শ্রেণির ঐসব লোকের সেবাদাস হিসেবে। শিক্ষা এদের(সাধারণ) জন্য নয়। ঐসব বনেদী শ্রেণির লোকের সেবা করা একার্থে ঈশ্বরেরই সেবার নামান্তর। মধ্যযুগীয় এ ধারণার কিছুটা অবসান হয় বৃটিশ ঔপনিবেশিক যুগে। বর্তমানে শিক্ষা সবার জন্য হলেও সাধারণ শিক্ষা শাখায় স্নাতকস্তরে অনার্স ও পাস কোর্সের মধ্যে উচ্চ ও নিম্ন শ্রেণির সমতুল্য বৈষম্য রয়েছে। মধ্যযুগীয় এ শ্রেণিকরণ প্রথা থেকে এখনো জাতি শাপমুক্ত হতে পারেনি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে ডিগ্রি ও মাস্টার ডিগ্রি পর্যায়ের অনেক কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। সে সময় অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬০% বা এর অধিক নম্বর পাওয়া ছিল কল্পনাতীত। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকরাতো বোধহয় কসম করেই থাকতেন প্রথম শ্রেণির নম্বর না দেয়ার ব্যাপারে। স্নাতক (পাস) কোর্সের ক্ষেত্রে এ বিশ্বাসটা বোধহয় আরো বেশি বদ্ধমূল। তবুও সৌভাগ্য বলতে হয় বিশ্বায়নের কল্যাণে শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গিরও কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে পূর্বের সেই রক্ষণশীলতা অনেকটা নেই। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে সাম্যতা রক্ষা করতে পারেননি। বর্তমানে অনার্স ও পাস কোর্সের একাডেমিক ইয়ার সমান হওয়া সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণে সমান সুযোগ দিচ্ছে না। যেমন এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিতে ভর্তিতে অনার্সে যেখানে ৫০% মার্কস চাওয়া হয়, সেখানে পাসকোর্সের ক্ষেত্রে ১০% বেশি অর্থাত্ কমপক্ষে ৬০% মার্কস থাকতে হবে। এর অর্থ হলো পাস কোর্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ একজন শিক্ষার্থী অনার্সের দ্বিতীয় শ্রেণি প্রাপ্ত একজন শিক্ষার্থীর সমান। এটি কোন যুক্তিতে করা হলো তা বুঝে উঠতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমাদের সন্মানিত শিক্ষক মহোদয়রা পাস কোর্সধারী শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় দয়া করে বেশি নম্বর দিয়ে থাকেন তার মাশুল গুনতে হচ্ছে উচ্চশিক্ষায়। অথচ পাস কোর্স থেকে পাস করে এ দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন এমন অনেক শিক্ষক ও গবেষক অতীতে ছিলেন বর্তমানেও আছেন। চাকরি ও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে যোগ্যতা পরিমাপের জন্য টেস্ট নেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সকলের জন্য একটি নির্ধারিত নম্বর অর্জন করতে হবে। পাস কোর্স ও অনার্সের জন্য আলাদা নম্বর নির্ধারণ মানেই একই রাষ্ট্রে দুটি শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করা। এরা সমান সুযোগ ভোগ করলে কোন কথা ছিল না। সমস্যা হলো এদের একটি অভিজাত অন্যটি সাধারণ। পাস কোর্স ধারী শিক্ষার্থীরা যদি সর্বক্ষেত্রে সমান সুযোগ না-ই পাবেন তবে এটি রেখে শিক্ষার্থীদের অপমান করার কোন অর্থ হয় না। একজন শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সত্ত্বেও তাকে পাস কোর্সে পড়ার অভিশাপে সমান সুযোগ না দেয়া রাষ্ট্রের সংবিধান পরিপন্থি ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এমন বৈষম্যপূর্ণ আচরণ নিঃসন্দেহে অমানবিক শুধু নয় অসৌজন্যও বটে।
কোন শিক্ষার্থী আর্থ-সামাজিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে অথবা দুর্ঘটনার কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ফলাফল আশানুরূপ না করার কারণে অথবা অন্য যে কোন কারণে স্নাতক (পাস) কোর্সে ভর্তি হওয়া মানেই শুরু থেকেই অনার্স কোর্সের যেকোন শিক্ষার্থী থেকে পিছিয়ে পড়ল। সৃজনশীলতা শুধু নম্বর বা জিপিএ দিয়ে হয় না এজন্য দরকার প্রতিভা। শিক্ষা যদি সবার জন্য উন্মুক্ত হয় তবে উচ্চশিক্ষাও সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। গবেষণা ক্ষেত্রে একজন গবেষক কাজ করেন তার সৃজনশীলতা, বুিদ্ধমত্তা, দক্ষতা ও নিজস্বতা দিয়ে। এ ক্ষেত্রে তার পূর্বের ডিগ্রি মুখ্য বিষয় নয়। স্নাতক পর্যায়ে অনার্স ও পাস কোর্সে সমান সুযোগ না থাকার ফলে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও চাকরির ক্ষেত্রে কয়েক লাখ উচ্চশিক্ষিত স্কলার নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণে ব্যর্থ। কাজ করার সুযোগ না দিলে শুধু কাগুজে যোগ্যতা দিয়ে কি করে প্রতিভা প্রমাণ করা সম্ভব? শিক্ষা মানুষের মধ্যে বৈষম্য নয় সমতা আনে, হিংষা-বিদ্বেষ দূর করে। যে শিক্ষা শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে এলিট ও সাধারণ শ্রেণি তৈরি করে সে শিক্ষা কী করে সমাজের বৈষম্য দূর করবে?
লেখক :অধ্যক্ষ , ন্যাশনাল কলেজ, বাড্ডা, ঢাকা ১২১২
e-mail : [email protected]
