পুষ্টিতথ্য

আর্থিক দৈন্যের মধ্যেও শিশুর সঠিক পুষ্টি সম্ভব

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৫৭
সুস্থ, সবল ও পরিপুষ্ট শিশু জাতীয় উন্নয়নে অপরিহার্য। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্টের প্রথম ও চতুর্থ লক্ষ্য হলো—ক্ষুধা ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শিশুদের সুস্বাস্থ্য, সঠিক বয়সে সঠিক খাবার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিশু পুষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ০-২৪ বয়স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, এই বয়সের খাদ্যাভাস পরবর্তী জীবনের শিশুকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ও শিশু মৃত্যুর হার কমায়। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে শিশু মৃত্যুর মূল কারণ হলো অপুষ্টি। আর এই অপুষ্টির মূল কারণ হলো মায়ের বুকের দুধ সঠিকভাবে না খাওয়ানো এবং পরিপূরক খাবার সঠিকভাবে না খাওয়ানো। শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হবার সাথে সাথে তার খাদ্যের চাহিদারও পরিবর্তন হয়। আমাদের দেশে শিশুদের অনেক খাবার পাওয়া গেলেও তা অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল এবং স্বাস্থ্যসম্মত নাও হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি ৪ জন শিশুর মধ্যে শুধুমাত্র ১ জন শিশু সুষম খাবার খায়। অথচ পারিবারিক খাবার থেকে খুব সহজেই এই বাড়তি খাবার তৈরি করা যায়। আইসিডিডিআর’বি এবং সিডনী ইউনিভার্সিটি সম্মিলিত হয়ে ‘শিশু পুষ্টি ট্রায়াল’ নামে একটি গবেষণা চলছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ৬, ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডকে। গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো-পিয়ার কাউন্সিলরের মাধ্যমে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ ও পরিপূরক খাবার খাওয়ানোর আচরণ বিধি উন্নত করা এবং ১৮ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর সঠিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায় কিনা তা দেখা। শিশু জন্মের পর শিশুর মূল যত্ন নেয় তার মা। এ প্রকল্পে শিশুকে ছয় মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং ছয় মাস পর বাড়তি খাবার খাওয়ানোর বিষয়ে মা ও পরিবারের সদস্যদের অনুপ্রাণিত করা হয়। এই গবেষণায় সমাজের বিভিন্ন উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও বস্তিতে থাকা মায়েদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রকল্পে পিয়ার কাউন্সিলররা প্রতিমাসে মায়েদের বাড়ি গিয়ে কিভাবে শিশুকে ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ ও পরিপূরক খাবার খাওয়ানো যায় সে সম্পর্কে নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কর্মীদের এ পরামর্শ সত্ত্বেও অনেক উচ্চবিত্ত মা আছেন যারা শিশুদের টিনের খাবার দিয়ে থাকেন। আবার এমনও মা আছেন যারা বস্তিতে বসবাস করে শিশুর জন্য উপযুক্ত পরিপূরক খাবার তৈরি করে লাভবান হয়েছেন। গবেষণার প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শতকরা ৬০ ভাগ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে সক্ষম হয়েছেন। প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত এক সফল মা মনি বললেন, যখন সে সাত মাসের গর্ভবতী তখন প্রকল্পের কর্মীরা এসে তাকে বিশ্রাম নিতে, আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া এবং জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে নানা রকম পরামর্শ দেয়। এভাবে সে শিশুকে ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাইয়েছেন। এতে শিশু সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল এবং তার কোন অসুখ হয়নি। প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত এমনই আর এক বস্তিবাসী মা রিনা। তার দুই সন্তান। পিয়ার কাউন্সিলরদের পরামর্শে তার ১১ মাস বয়সী শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি পারিবারিক খাবার থেকে পরিপূরক খাবার তৈরি করে খাওয়ান। তিনি বলেন, ‘এতে শিশুর অসুখ-বিসুখ কম হয়, ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না, সময় বাচে, টাকা-পয়সার দিক দিয়ে খরচ কমে, কারণ কৌটার দুধ কিনতে গেলে ৫০০-৫৫০ টাকা লাগতো। অথচ সঠিক পুষ্টি সে পারিবারিক খাবার থেকেই পাচ্ছে।’ রিনার মতে, আমাদের দেশের মায়েরা আর্থিক দৈন্যতার মধ্যেও পারিবারিক খাবার থেকে শিশুকে খাইয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন এবং এর মাধ্যমে শিশুর সঠিক পুষ্টিও নিশ্চিত করা সম্ভব। এই উদ্যোগে অধিকাংশ মা এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া এসেছে। এই প্রসংগে প্রকল্পের গবেষক সাবরিনা রশিদ বলেন, ‘শিশু পুষ্টি প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা শিশু খাদ্যের ব্যাপারে মায়েদের অভ্যাস পরিবর্তন করতে পেরেছি। যদি এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা অপুষ্টির হার কমাতে পারি, তবে ভবিষ্যতে এধরনের উদ্যোগ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সংযুক্ত করার ক্ষেত্র তৈরি হবে।’ লেখক :আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত