সামান্য ক্ষতি!

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৪, ২২:০২
সীতাকুণ্ড ন্যাড়া (বৃক্ষশূন্য) পাহাড় বনায়ন প্রকল্পের আওতায় বিপুল অর্থব্যয়ে প্রায় এক দশকের সযত্ন পরিচর্যায় চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ২৫ কিলোমিটারব্যাপী যেই বনাঞ্চলটি গড়িয়া তোলা হইয়াছিল—একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবকের সৃষ্ট তাণ্ডবে তাহার একাংশ ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছে। পুড়িয়া গিয়াছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় তিন হাজার মূল্যবান বৃক্ষ। ইত্তেফাকসহ একাধিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার বিকালে ৩০-৩৫ জনের সশস্ত্র একটি গ্রুপ সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে প্রবেশ করিয়া কয়েকটি দোকানে আগুন ধরাইয়া দেয়। সেই আগুন এক পাহাড় হইতে অন্য পাহাড়ে ছড়াইয়া পড়ে। দীর্ঘ পাঁচঘন্টা প্রাণান্ত পরিশ্রম করিয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। অল্পের জন্য রক্ষা পায় বিমান বাহিনীর একটি টাওয়ার। দশকের পর দশক ধরিয়া এই দেশে ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা প্রদর্শনের বিচিত্র রকম দৃষ্টান্ত আমরা দেখিয়া আসিতেছি। তবে ইকোপার্ক ও বৃক্ষের প্রতি তাহাদের এমনতর আক্রোশ অভিনবই বলিতে হইবে। ব্যতিক্রম শুধু এইটুকু যে, ৫টি সিএনজিসহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বৃহদংশকেই আটক করা হইয়াছে তাত্ক্ষণিকভাবে। ইহার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যরা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে ক্ষমতার যে সর্বব্যাপী দাপট দেখা যাইতেছে তাহাতে এই আটকাবস্থা কতক্ষণ স্থায়ী হয়—তাহাই এখন দেখিবার বিষয়। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন যে পরস্পর অবিচ্ছেদ্য—তাহা কোনো নূতন কথা নহে। সীতাকুণ্ডে যাহা ঘটিয়াছে তাহা আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি প্রদর্শনের নামান্তর মাত্র। আর ইহা যে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা হইতে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নহে—তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না। ইহার কারণও সুবিদিত। ক্ষমতার দাপট যাহারা দেখাইতেছেন তাহারা জানেন যে, আইন তাহাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করিবে না বা করিতে পারিবে না। নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করিবার এই সর্বনাশা প্রবণতা যে হঠাত্ করিয়া সৃষ্টি হয় নাই তাহাও সর্বজনবিদিত। সকল সরকারের আমলেই দেশবাসীকে অসহায়ভাবে ক্ষমতার এই দাপট প্রত্যক্ষ করিতে হইয়াছে। সরকার বদলাইয়াছে, কিন্তু দাপট বদলায় নাই। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে যে, বাঁশের চাইতে কঞ্চির দাপটই অধিক। আইন তাহার নিজস্ব গতিতে চলিলে এবং প্রশাসন কাহারও মুখের দিকে না তাকাইয়া তাহার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিলে যে এমন হইত না— তাহা নিঃসন্দেহে বলা চলে। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে দীর্ঘকাল যাবত্ আইন যেমন নিজস্ব গতিতে চলিতেছে না বা চলিতে পারিতেছে না, তেমনি প্রশাসনও তাহার সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যত্নবান নহে। ইহার পরিণামে শুধু যে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে তাহাই নহে, সেই সাথে নড়বড়ে হইয়া পড়িতেছে কষ্টার্জিত গণতন্ত্রের শিকড়ও। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে, ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি অসামান্য চিত্র তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। শীত নিবারণের জন্য রাণীর নির্দেশে দরিদ্র প্রজাদের গৃহে অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছিল। তাহাতে অসংখ্য মানুষ সর্বস্বান্ত হইলেও প্রজাবিচ্ছিন্ন ঐশ্বর্যবতী রাণীর নিকট ইহা ‘সামান্য ক্ষতি’ বলিয়াই প্রতীয়মান হইয়াছিল। তদ্রূপ ক্ষমতার গজদন্তমিনারবাসী উচ্ছৃঙ্খল তরুণদের নিকটও হাজার হাজার বৃক্ষ পোড়াইয়া দেওয়ার ব্যাপারটি সামান্য ব্যাপার বলিয়াই মনে হইতে পারে। কিন্তু ইহা মোটেও সামান্য ব্যাপার নহে। নীতিনির্ধারকদের শুধু বিষয়টি অনুধাবন করিলেই চলিবে না, অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে যথাযথ দৃষ্টান্তও স্থাপন করিতে হইবে। অন্যথায় ইহা বিষবৃক্ষে পরিণত হইয়া গোটা সমাজকেই গ্রাস করিয়া ফেলিবে বলিয়া আমাদের আশঙ্কা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন