ইস্টার সানডে উদযাপনকালে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে দেড় লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস অনুসারীদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে সিরিয়া, ইউক্রেইন এবং আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশে চলমান সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানাইয়াছেন। ইহা ছাড়াও তিনি বিশ্বের অগণিত মানুষের ক্ষুধা মুক্তির আহ্বান জানাইয়া সম্পদশালীদের ক্রমবর্ধমান অপচয়েরও নিন্দা করিয়াছেন। খ্রিস্টান বিশ্বাসীরা মনে করেন যিশুখৃস্ট ক্রুশবিদ্ধ ও নিহত হইবার পরের রবিবারে মৃত্যুর দেশ হইতে জীবিত হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছিলেন সমগ্র মানবজাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ নিশ্চিত করিতে। সেই উপলক্ষেই ইস্টার সানডে বিশেষ পবিত্র দিবস হিসাবে পালিত হয় খৃস্টান বিশ্বে। পোপ এই দিনে সারা বিশ্বে চলমান যুদ্ধের অবসান চাহিয়াছেন এবং ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়িবার আহ্বান জানাইয়াছেন।
যুদ্ধে দীর্ণ এবং অসাম্যে ভরা আজকের পৃথিবীতে পোপের এই প্রার্থনা বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। সভ্যতার শুরু হইতেই যুদ্ধ একটা অভিশাপ হিসাবে মানুষের বিনাশ ঘটাইয়া চলিয়াছে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাড়িয়াছে যুদ্ধের তীব্রতা ও ক্ষতির মাত্রা। আমরা যেন এক অনন্ত যুদ্ধের কালে বসবাস করিতেছি। দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সংখ্যা কমিয়া আসিলেও বহুগুণে বাড়িয়া গিয়াছে দেশ ও জাতির অভ্যন্তরে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের পরিমাণ ও স্থায়ীত্ব। একইসঙ্গে বাড়িয়াছে বহুজাতিক সমঝোতায় ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের’ মতো প্রক্রিয়াগুলি। মানব সভ্যতা কিংবা গণতন্ত্র কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলিয়াই প্রতিটি দেশের সমাজ জীবনকে করা হইতেছে যুদ্ধ ও সংঘাতে দীর্ণ। আজ যুদ্ধই নির্ধারণ করিয়া দিতেছে আমাদের অর্থনীতি, নীতি ও নৈতিকতা, আইন এবং আমাদের জীবন। আর যুদ্ধবাজগণের হস্তগত এখন অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্রসজ্জিত যাহা বহু দূর হইতেও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু ভেদ করিতে পারে, এমনকি মানুষের জীবন ও জনপদ ধ্বংস করিতে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পাঠাইবার প্রয়োজনীয়তাও ফুরাইয়াছে, দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রসজ্জিত ‘ড্রোন’ নামের বিমান নিজেই ধ্বংসযজ্ঞ চালাইয়া আসিতে পারে। একদিকে যেমন যুদ্ধ-সংস্কৃতি আজ ভয়ানক মাত্রায় আমাদিগকে সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত করিয়া রাখিতেছে, অন্যদিকে অনন্ত যুদ্ধের মতোই বাড়িয়া চলিয়াছে সম্পদের আকাশ সমান বৈষম্য। ফলত পৃথিবীতে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীন। একশত কোটি মানুষ প্রতিদিন ক্ষুধা নিয়া ঘুমাইতে যায়। কেবল যুদ্ধাক্রান্ত জনপদেই নয়, সকল দেশেই বৃহদাংশ মানুষের জীবনে অনাহার ও অপুষ্টি নিত্যসঙ্গী হইয়া উঠিয়াছে। আর, এই ক্ষুধাতুর অনাহারক্লিষ্ট বঞ্চিত কোটি কোটি মানুষের শ্রমঘামের সুফল ভোগ করিতেছে উঁচুুতলার একভাগ মানুষ। মাত্র কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করিতেছে পৃথিবীর বেশিরভাগ সম্পদ। তাহাদের বিপুল অপচয়ে ভরা উজ্জ্বল আলোকিত জীবনের নিচে আটকাইয়া থাকা জমাট অন্ধকারে গুমরাইয়া মরিতেছে মানবতা।
ক্ষুধা, অসাম্য, অপচয় আর যুদ্ধের করতলে পিষ্ট এই পৃথিবী আমাদের কাম্য হইতে পারে না। আমরা চাই সহনশীলতা ও শান্তির সমাজ। আমরা চাই প্রকৃত গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির সমাজ। অনাহার আর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ভয়শূন্য সমাজ। পোপের বাণী অনুসরণ করিয়া আমাদিগকে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী গণতান্ত্রিক সমাজ কায়েমের জন্য কাজ করিয়া যাইতে হইবে। প্রাণ ও জীবনঘাতী যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদেরকেই সোচ্চার হইতে হইবে এবং সকলের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সন্ধান করিতে হইবে।
