মনোবিদের পাঠশালায় ক্রিকেটাররা

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৪, ২২:১০
খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি বাড়ানোর জন্য পৃথিবীর নানা দেশে করা হয় না এমন কোনো কাজ নেই। খেলোয়াড়দের পর্বতে চড়ানো, বনে অভিযানে নামানো থেকে শুরু করে সেনা প্রশিক্ষণ; অনেক কিছুই করানো হয় মানসিক শক্তি বাড়াতে। সেই সঙ্গে সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাপার হল, মনস্তত্ত্ববিদের স্মরণ নেয়া। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য এই কাজ আগেও অনেকবার করা হয়েছে। আবারও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ধাক্কা সামলে নিতে এবং আসছে চ্যালেঞ্জের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে মনোবিদের স্মরণাপন্ন হলো ক্রিকেটাররা। দেশসেরা ৩২ ক্রিকেটারকে নিয়ে গতকাল থেকে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে তিন সেশনের এক কোর্স শুরু করেছেন কানাডা প্রবাসী ক্রীড়ামনোবিদ ও সাফল্য-মনস্তত্ত্ব গবেষক আলী আজহার খান। আলী আজহারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশেই। জাতীয় দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটারের সম্পর্কে তিনি ‘বড় ভাই’! কারণ, বিকেএসপির সাবেক ছাত্র ও টেনিস খেলোয়াড় এই আলী আজহার। পরবর্তীকালে টেনিস কোচ ছিলেন আলী আজহার। এরপর মনোবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছেন গত প্রায় ১৪ বছর ধরে। তার কাজের ক্ষেত্র মূলত ব্যক্তি ও করপোরেট-টিম পর্যায়ে সাফল্য নিয়ে। এনএলপি (নিউরো লিঙ্গুয়িস্টিকস প্রোগ্রামিং) নামে জনপ্রিয় যোগাযোগ, ব্যক্তি-উন্নয়ন ও মানসিক উন্নয়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন তিনি। নিজে খেলোয়াড় ছিলেন বলে খেলাধুলায় এই পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়েই বেশি কাজ করতে হয় তাকে। বাংলাদেশ দলের ক্ষেত্রে আলী আজহার খানের পাঠশালা শেষ পর্যন্ত কতোটা কাজে দেবে, সেটা সময় বলতে পারবে। তবে আপাতত ক্রিকেটাররা বলছেন, প্রক্রিয়াটা তাদের সন্তুষ্ট করছে। যেমন গতকাল প্রথম দিনের সেশন শেষে এনামুল হক বিজয় বলছিলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় এটা আমাদের জন্য অনেক কাজে দেবে। আমরা এটা উপভোগ করেছি। অনেক সময় আমাদের যে কাজটা করা উচিত ছিল সেটা করতে পারি নাই। সব মিলিয়ে এটা ভালো। সব মিলিয়ে আমরা কিভাবে আত্মবিশ্বাসী থাকতে পারি, আমরা কিভাবে মেন্টালি আরো শক্ত থাকতে পারি এসব ব্যাপারেই বলা হয়েছে।’ বিজয়ের বিশ্বাস, এখানে তারা যা শিখছেন, সেটা ধরে রাখতে পারলে অন্তত মাঠে চাপটা ভালোভাবে সামলাতে পারবেন তারা, ‘প্রত্যেকটা মানুষের নিজস্ব কনফিডেন্স লেভেল থাকে। কিন্তু আমরা সব সময় সেই আত্মবিশ্বাসটা ধরে রাখতে পারি না। আমরা এখানে যা শুনছি সেটা যদি প্রয়োগ করতে পারি চাপের সময় আমরা সেটা হ্যান্ডেল করতে পারবো। অনেক সময় নেগেটিভ যা হচ্ছে সেটাও হয়তো আমাদের পক্ষে আসতে পারে। আমরা চাপ কিভাবে হ্যান্ডেল করতে পারবো, পজেটিভ কি আছে সেটা নিয়েই কথা হয়েছে।’ তরুণ বিজয়ের মতো এতোটা নিশ্চিত নন রাজ্জাক। তিনি শেষ পর্যন্ত বুঝতে চান, ব্যাপারটা কী হচ্ছে। তবে এটা ঠিক যে, মনোবিদের কথাবার্তায় তিনি মনে করছেন, এতে তাদের উপকারই হবে। নিজের মতো করে রাজ্জাক ব্যাখ্যা করলেন, ‘ উনি সব কিছু প্র্যাকটিক্যালি দেখেন—কি হলে কি হতে পারে। আমি করি মাঝে-মধ্যে এটা হলে ভালো। একটানা অনেক খেলা থাকলে কেউ মেন্টালি রিল্যাক্স হয়ে যেতে পারে কেউ কম মোটিভেটেড থাকতে পারে। এগুলো করলে উপকার হয়। পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়বে কি না জানি না মেন্টালি অনেক ভালো হবে।’ তবে আলী আজহার বলছেন, পারফরম্যান্সেও প্রভাবটা পড়ার কথা। তিনি নানান মানসিক স্তর, শারীরিক ব্যাপার এবং জৈব-রাসায়নিক আলোচনা করেই বোঝালেন এ ধরনের সেশনে আত্মবিশ্বাস ও মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশের খেলা দেখা ও খেলোয়াড়দের চেনার অভিজ্ঞতা থেকেই বললেন, ‘আমি তো আজকে থেকে ওদের চিনি না ওদের খেলা দেখি ওদের অ্যানালাইসিস করি। যেহেতু আমি সাইকোলজি নিয়ে কাজ করি ওদের কোথায় সাইকোলজি মিসিং সেটা দেখি। শুধু ক্রিকেট না আইস হকি বা টেনিস যে খেলাই দেখি এটাই করি। ওদের ব্যাপারে কিছু ধারণা ছিলই। এরই মধ্যে তামিম ইকবালের সঙ্গে নাসির হোসেনের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। মুশফিকের সঙ্গে একটি সেশন করেছি আমি দেখেছি যে ঘুরে-ফিরে একই বিষয়ই বারবার আসছে। খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে শক্ত থাকতে পারছে না। মডিয়ার চাপ বলেন, জনগণের চাপ বলেন, প্রত্যাশার চাপ বলেন, ক্যারিয়ারের চাপ বলেন; সবকিছু মিলিয়ে সেরা পারফরম্যান্সটা করতে পারছেন না ক্রিকেটাররা। এখন এই চাপ-টাপ, এগুলো তো থাকবেই; এগুলোকে তো উধাও করে দিতে পারবেন না। আমাদের কাজ হল, এসবের মধ্যেই ইতিবাচক ব্যাপারটা খুঁজে পাওয়া।’ আলী আজহার মনে করেন, ক্রিকেটারদের যোগ্যতায় কোনো ঘাটতি নেই। সেটা থাকলে তারা মাঝে মাঝে ভালো খেলতে পারতেন না। ফলে তাদের সমস্যাটা মনোজগতে। এই সমস্যায় চাপ যেমন একটা ব্যাপার, তেমনই অনিশ্চয়ই ও নিরাপত্তাহীনতার চিন্তাটাও ব্যাপার। আলী আজহার বলছেন, এই অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতাকেও ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে, ‘দুনিয়াতে যে কোনো মানুষ সব সময় একটা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। নিরাপত্তাহীনতা সব সময়ই থাকবে। এটা স্বাভাবিক, এটা ভালো। নিরাপত্তাহীনতা না থাকলে তুমি কখনোই কঠোর পরিশ্রম করবে না। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার কারণে যদি পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা খারাপ। আমরা এই ব্যাপারটারও ইতিবাচক দিক নিয়ে কাজ করবো।’ একই সঙ্গে আলী আজহার মনে করেন, এই ধরনের সেশন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকা উচিত। তিনি না হলেও অন্য কারো এটা চালিয়ে যাওয়া উচিত। যারা অংশ নিচ্ছেন মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মর্তুজা, আব্দুর রাজ্জাক, মাহমুদউল¬াহ রিয়াদ, শামসুর রহমান, রকিবুল হাসান, ইলিয়াস সানি, আরাফাত সানি, আবুল হাসান রাজু, শফিউল ইসলাম, শাহরিয়ার নাফিস, সাব্বির রুম্মন, তাসকিন আহমেদ, সৌম্য সরকার, এনামুল হক জুনিয়র, নাঈম ইসলাম, রবিউল ইসলাম, সাজিদুল ইসলাম, শুভাগত হোম, ডলার মাহমুদ, নাসির হোসেন, ইমরুল কায়েস, এনামুল হক বিজয়, রুবেল হোসেন, মুমিনুল হক, সোহাগ গাজী, জিয়াউর রহমান, মার্শাল আইয়ুব, নাজমুল হোসেন, ফরহাদ রেজা, মিঠুন আলী, আল-আমিন।