মিলিবাগ বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষি বিজ্ঞানীদের নিকট অতিপরিচিত একটি পোকার নাম। কেননা মিলিবাগের অনেক প্রজাতি আমাদের দেশের শাক-সবজি ও ফলমূলের প্রভূত ক্ষতিসাধন করে থাকে। ইতোপূর্বে যতগুলো প্রজাতির মিলিবাগ এদেশে ছিল তাদের আকার আকৃতি জায়ান্ট মিলিবাগের তুলনায় বেশ ছোট। উনিশ শতকে (১৯০০) ভারতীয় উপমহাদেশে জায়ান্ট মিলিবাগ সর্বপ্রথম সনাক্ত করা হয়। এ পোকাটি সাধারণত ভারত উপমহাদেশসহ অন্যান্য উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে পাওয়া যায়। অতিসমপ্রতি বাংলাদেশে এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং বিগত দুই বছর যাবত্ বিভিন্ন স্থানে জায়ান্ট মিলিবাগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সর্বপ্রথম আমরা পোকাটি সনাক্ত করি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে। এ বছর হোম ইকোনমিক্স কলেজ, ঢাকা-তে জায়ান্ট মিলিবাগ দুর্যোগের ন্যায় আবির্ভূত হয় । এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় সম্ভাবতই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিশেষজ্ঞ প্রেরণের জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন যার প্রেক্ষাপটে হোম ইকোনমিক্স কলেজ সরেজমিনে পরিদর্শন করার সুযোগ আমার হয়। আমরা কর্তৃপক্ষকে জায়ান্ট মিলিবাগ প্রতিরোধের উপায় ও দিকনির্দেশনা দিয়ে আসি। যেহেতু বিষয়টি অতীব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ, তাই এ পোকাটি সম্পর্কে দেশবাসীকে সচেতন করতে এবং এর বিস্তার প্রতিরোধ করতেই এই লেখা।
পোকার পরিচিতি: বহুল আলোচিত জায়ান্ট মিলিবাগের বৈজ্ঞানিক নাম - Drosicha stebbingi Green (Hemiptera: Pseudococcidae). পোকাটির দেহ ডিম্বাকৃতির ও চ্যাপ্টা। আকারে প্রায় ১ সে.মি. লম্বা, মাংসল, দেহের চারিদিকে পাউডারের ন্যায় মোম জাতীয় পদার্থ থাকে, গায়ের রং ধূসর সাদা। স্ত্রী পোকা পাখা বিহীন এবং হেঁটে চলাচল করে। পুরুষ পোকার দেহ কিছুটা লালচে এবং পাখা যুক্ত হওয়ায় উড়তে পারে। এ পোকার জীবনচক্র একটু ভিন্ন ধরনের। গাছে বসবাসরত পুরুষ ও স্ত্রী পোকার মিলনের পর স্ত্রী পোকা নিচে মাটিতে নেমে আসে এবং গাছের গোড়ার নিকটবর্তী মাটির প্রায় ৫-১৫ সে.মি. গভীরে গুচ্ছভাবে ডিম পাড়ে। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিটি স্ত্রী পোকা সাধারণত ৩০০-৪০০টি ডিম দেয় এবং ডিমপাড়া শেষ হয়ে গেলে মারা যায়। পুরুষ পোকা এক মাসের মত জীবিত থাকে। মাটির নিচের ডিমগুলো হতে বাচ্চা ফুটতে কয়েক মাস সময় লাগে, সাধারণত ৬ মাস। নভেম্বর মাসের শেষ হতে মার্চ মাস পর্যন্ত ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এই ক্ষুদ্রাকৃতির নিম্ফ (বাচ্চা) হেঁটে হেঁটে গাছের উপর উঠে পড়ে এবং গাছের ডালপালার অগ্রভাগের নরম অংশ হতে রস শোষণ করে খেয়ে বড় হওয়ার পর আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। পরিশেষে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে পূর্বের ন্যায় জীবনচক্র সম্পন্ন করে।
পোকার প্রাদুর্ভাব ও ক্ষতির প্রকৃতি: জায়ান্ট মিলিবাগ ফলদ ও বনজ গাছ এবং ঝোপ জাতীয় বৃক্ষকে আক্রমণ করে বেঁচে থাকে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে এরা নিকটতম বাসগৃহে প্রবেশ করে যেমনটি হোম ইকোনমিক্স কলেজ ঢাকা-তে হয়েছে। এদেরকে ঘরের দেয়ালে, দরজা, জানালা এবং মেঝেতে দেখা যায়। জায়ান্ট মিলিবাগ ৬০টিরও অধিক ফলদ এবং বনজ গাছের প্রজাতিকে আক্রমণ করে। বাংলাদেশে আম, জামরুল, কাঁঠাল এবং কড়ই জাতীয় বৃক্ষে এ পোকার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। পূর্ণাঙ্গ পোকা ও নিম্ফ গাছের শাখা-প্রশাখার অগ্রভাগের কচি অংশ যেমন কচিপাতা ও কচি ডগা, পুষ্প মঞ্জুরী এবং ফলের বোঁটা হতে রস শোষণ করে খায়। আক্রান্ত গাছ ক্রমান্বয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, ফুলের মুকুল ও কচি ফল ঝরে পড়ে। তাছাড়া এই পোকা হানিডিউ (কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ তরল) নিঃসরণ করে যা পাতা ও ফলের উপর ছত্রাক জন্মাতে সাহায্য করে। পোকাটি দেহের সংস্পর্শে আসলে চুলকানি ও এলার্জি হয়।
জায়ান্ট মিলিবাগ দমন ব্যবস্থা:পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা সংগ্রহ ও ধ্বংস করা: যেহেতু স্ত্রী পোকা ডিম পাড়ার জন্য গাছ হতে মাটিতে নেমে আসে, তখন পোকা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে হবে। তাছাড়া ফানেলট্রেপ ব্যবহার করে মাটিতে নামতে আসা পোকা দমন করা যায়। ট্রেপটি তৈরী করা অত্যন্ত সহজ। এক্ষেত্রে ষ্টেনলেস ষ্টিলের সিট কেটে ফানেলের আকৃতি তৈরি করে গাছের কাণ্ড ঘিরে আটকিয়ে দিতে হবে। ট্রেপ ও গাছের বাঁকলের মাঝে কোন ফাঁকা থাকলে তা মোম দিয়ে বন্ধ করতে হবে এবং ট্রেপে পাউডার জাতীয় কীটনাশক ছিটিয়ে রাখতে হবে। পোকা যখন গাছের উপর হতে নিচে নামতে যাবে তখন ফানেল ট্রেপে আটকা পড়বে এবং কীটনাশকের সংস্পর্শে মারা যাবে।
মাটি শোধন: যেহেতু পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা গাছের গোড়ার চারিদিকের মাটিতে ডিম পাড়ে তাই মাটি (গাছ হতে ২ মিটার পর্যন্ত) কুপিয়ে তাতে কীটনাশক ছিটিয়ে দিতে হবে। ক্লোরপাইরিফস ১.৫ ডি গাছ প্রতি ২৫০ গ্রাম অথবা সেভিন ১০ডি গাছ প্রতি ৫০ গ্রাম হারে ডিসেম্বর মাসের শুরুতে প্রয়োগ করতে হবে। এতে মাটিতে বিদ্যমান ডিম ও সদ্য প্রস্ফুটিত বাচ্চা কীটনাশকের সংস্পর্শে মারা যাবে।
কীটনাশক প্রয়োগ: যদি গাছ আক্রান্ত হয়ে যায় সেক্ষেত্রে সেভিন ৮৫ এসপি ৩.৫ গ্রাম/লিটার পানিতে মিশিয়ে অথবা ডাইমেথয়েট ৪০ইসি/ফিপ্রোনিল ৫০ ইসি/ডেল্টামেথ্রিন ২.৫ ইসি কীটনাশকের তিন মিলিলিটার প্রতি এক লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
পোকাটি বাংলাদেশে মহামারী ধারণ করবে কিনা?
পাখা বিহীন হওয়ায় জায়ান্ট মিলিবাগ হেঁটে চলাচল করে বিধায় দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া এই প্রজাতিটি বছরে মাত্র একটি জীবনচক্র সম্পন্ন করে বংশ বিস্তার করে ফলে পোকার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে না। কেবলমাত্র কোন একটি এলাকায় বহু বছর বংশ বিস্তার করলে মহামারী হতে পারে। কাজেই জায়ান্ট মিলিবাগ দেখামাত্র নির্মূলের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বাংলাদেশে মহামারী ঠেকানো সম্ভব। আর এর জন্য প্রয়োজন কৃষি, বন এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যকরী উদ্যোগ। বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রামে অভ্যস্ত এবং ক্ষুধা, মন্দা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সফলতার সহিত মোকাবিলা করতে পেরেছে। আমাদের বিশ্বাস বাংলার সংগ্রামী কৃষক ও কৃষি বিজ্ঞানীগণ সফলতার সাথে বাংলার মাটি হতে জায়ান্ট মিলিবাগকে নির্মূল করতে সমর্থ হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইলঃ [email protected]
