এপ্রিল মাস জুড়িয়া তীব্র দাবদাহের সহিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও পাল্লা দিয়া বৃদ্ধি পাইয়াছে। বাতাসে আর্দ্রতা নূ্যূনতম পর্যায়ে থাকায় এই সময়টায় এমনিতেই দাহ্যবস্তু যেন প্রস্তুত হইয়া থাকে স্ফুলিংগ পাইবার জন্য। সেই স্ফুলিংগ এখন হরহামেশাই ঘটিতেছে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিটসহ নানা কারণে। তবে শর্ট সার্কিটের প্রধান কারণ অসাবধানতা। বিদ্যুত্ ক্রমশ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাইয়া যাইতেছে বলিয়া অগ্নি দুর্ঘটনার সংখ্যা অসতর্কতার জন্য গ্রামাঞ্চলেও বৃদ্ধি পাইয়াছে। দুশ্চিন্তার কথা হইল, নামকরা প্রতিষ্ঠানসমূহের ভবনে অগ্নি নির্বাপণের আধুনিক ব্যবস্থা থাকিলেও তাহা বেশির ভাগ সময় আগুনকে প্রাথমিক অবস্থায় মোকাবিলা করিতে ব্যর্থ হইতেছে। ফলস্বরূপ ঘটিতেছে ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা। গত মঙ্গলবার রাতে সাভারে একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্রের কারখানায় আগুন লাগিলে তাহা নির্বাপণ করিতে নিয়োজিত হয় ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট। অথচ প্রাথমিকভাবে কারখানাটির কর্মীরা নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় আগুন নিভাইতে গিয়াও ব্যর্থ হয়। গত বুধবার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় আগুনে পুড়িয়াছে একটি প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠানের ফোমের গুদাম। আমরা স্পষ্টতই লক্ষ্য করিতেছি, গার্মেন্টস শিল্পকারখানা কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বৃহত্ ভবনসমূহে অগ্নিনির্বাপণের যাবতীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই আগুনের সূত্রপাত ঘটে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির শর্ট সার্কিটে। কোনো ভবনে বা কারখানায় যদি দাহ্যজাতীয় পদার্থেরও আধিক্য থাকে, সেই ক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিয়মনীতি অনুসরণ করা হইলে অগ্নি দুর্ঘটনার আশঙ্কা নাই বলিলেই চলে। তুলনামূলক দাহ্যপদার্থপূর্ণ ভবনসমূহে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা কেন তেমন করিয়া কার্যকর ভূমিকা রাখিতে পারিতেছে না, সেই ব্যবস্থার ভিতরে গলদ আসলে কোথায় রহিয়াছে—তাহার অনুসন্ধান আবশ্যক।
দেশের বিভিন্ন স্থানে যেই অগ্নিকাণ্ড ঘটিতেছে, তাহার প্রধান কারণ দাহ্যপদার্থবেষ্টিত পরিবেশে বসবাস ও সেই বিষয়ে সচেতনতার অভাব। গ্রামে-গঞ্জে বা ছোটখাটো শহরে কোথাও আগুন লাগিলে চকিতে ত্বরিতে বাহিরের খোলা জায়গায় চলিয়া আসিয়া প্রাণ বাঁচানোর ছোট্ট সুযোগটুকু অনেক সময় পাওয়া যায়। কিন্তু খাঁচাবদ্ধ নাগরিক জীবনে সেই সুযোগটুকুও সুদূরপরাহত। তাহা ছাড়া অসংখ্য বহুতল ভবন গড়িয়া উঠিয়াছে সরু গলির ভিতরে। সেইখানে আগুন লাগিলে দমকল কর্মীদের আগুন নির্বাপণ করিতে যারপরনাই গলদঘর্ম হইতে হয়। রাস্তার যানজট ঠেলিয়া, সরু রাস্তা বা গলি অতিক্রম করিয়া অগ্নিদুর্ঘটনার নিকট পৌঁছাইবার পূর্বেই যাহা দাহ্য হইবার তাহা ভস্ম হইয়া যায়। বহুতল ভবন নির্মাণের সময় ইহা বিবেচনায় রাখা আবশ্যক। কেননা, আগুন শুধু সম্পদহানিই করে না, তাহা নির্মমভাবে প্রাণহানি ঘটায়। আগুন হইল সেই শক্তি, যাহার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানব জীবনকে সহজতর ও সুন্দর করে। বিপরীতে, এই আগুনই অনিয়ন্ত্রিত হইয়া গেলে সমূহ সর্বনাশ। তাহার লেলিহান শিখা গ্রাস করে জগতের সুন্দর-অসুন্দর, ভালো-মন্দ—সকল কিছু। সভ্যতা সৃষ্টিতেও মূল অনুষঙ্গ আগুন, ধ্বংসেও আগুন। সুতরাং আগুনকে যাহাতে শুধু সৃষ্টি বা কল্যাণকর কাজেই ব্যাপৃত রাখা যায়, সেই সচেতনতার বিকল্প নাই। কী কী কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটে তাহা যেমন জানা প্রয়োজন, তেমনি আগুনের ধর্ম, উত্স, স্বভাব ও অনুঘটকসমূহ কী কী এবং আগুনের আগ্রাসী অবস্থায় পৌঁছাইবার পূর্বেই প্রাথমিক অবস্থায় কীভাবে আগুনকে নিয়ন্ত্রণে লইয়া আসা যায়, তাহা অন্তত প্রত্যেক নাগরিকেরই জানিয়া রাখা অবশ্য কর্তব্য। তাহাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অগ্নিনির্বাপণের মহড়ার মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরি করা যাইতে পারে। ইহাও মনে রাখিতে হইবে যে, কেহ নিজে যত সচেতনই হউন, তাহার পাশের ব্যক্তিটির অসচেতনতার কারণেও সকলে অগ্নি দুর্ঘটনার শিকার হইতে পারেন। তাই শুধু নিজে সচেতন হইলেই কাজ শেষ হয় না, অন্যকে সচেতন করাও আমাদের সকলের নাগরিক দায়িত্ব বটে।
