ওবামার এশিয়া সফর ও চীন-জাপান বিরোধ

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৪
গত বুধবার হইতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সপ্তাহব্যাপী এশিয়ার পাঁচ দেশ তথা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন সফর শুরু হইয়াছে। সফর শুরু করিবার একদিন পূর্বে জাপানের একটি পত্রিকাকে প্রদত্ত লিখিত সাক্ষাত্কারে পূর্ব চীন সাগরে একটি দ্বীপের অধিকার লইয়া বিবাদে লিপ্ত দুই পক্ষের মধ্যে চীনকে দূরে ঠেলিয়া জাপানের পক্ষ অবলম্বন করেন ওবামা। ইতোমধ্যে জাপানে অবস্থানকালে এইব্যাপারে প্রথমবারের ন্যায় প্রকাশ্যে জাপানকে সমর্থন করিয়াছেন তিনি। ওয়াশিংটনের এহেন ঘোষণায় টোকিও উল্লসিত হইলেও বেইজিং যে নাখোশ হইয়াছে তাহা বুঝিতে অসুবিধা হইতেছে না কোনভাবেই। উল্লেখ্য, বিবাদের উত্স পূর্ব চীন সাগরে অবস্থিত দ্বীপটিকে চীনারা ‘দায়যু’ এবং জাপানীরা ‘সেনকাকু’ নামে ডাকিয়া থাকে। সর্বশেষ খবরে জানা যায়, জাপান সফর শেষ করিয়া ওবামা বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করিতেছেন। বারাক ওবামার মতে, দ্বীপটি যেইহেতু জাপানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রহিয়াছে সেইহেতু এই দ্বীপ লইয়া যেকোন বিবাদে ইউএস-জাপান ট্রিটি অফ মিউচুয়াল কো-অপারেশন অ্যান্ড সিকিউরিটি-এর ধারা-৫-এর আওতায় জাপানের পার্শ্বে দাঁড়াইবে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের প্রতি ইঙ্গিত করিয়া ওবামা আরও জানাইয়াছেন যে, দ্বীপের উপরে জাপানের নিয়ন্ত্রণ ক্ষুণ্ন্ন করিবার যেকোন চেষ্টার ব্যাপারে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাইবে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সহিত সম্পর্ক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার কথা জানাইলেও তাহা জাপানের সহিত সম্পর্কের বিনিময়ে হইবে না বলিয়াও জানাইয়া দিয়াছেন ওবামা। বস্তুত ওবামার এশিয়া সফরের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের লোকজনেরা এই ধরনের কথাবার্তাই বলিতে থাকেন। এইভাবে প্রেসিডেন্টের জন্য জমিন প্রস্তত করিয়া রাখেন। উদাহরণস্বরূপ, ওবামার এশিয়া সফরের অল্প কিছু দিন পূর্বে এশিয়া সফর করেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল। তিনি ২০১৭ সন নাগাদ জাপানকে নূতন করিয়া দুইটি ব্যালেস্টিক মিসাইল ডিফেন্স ডেস্ট্রয়ার যোগানের ঘোষণা দেন যাহা চীনের সহিত ভূখণ্ড লইয়া বিরোধ এবং উত্তর কোরিয়ার মিসাইল হামলা ঠেকাইতে কাজে লাগিবে। দ্বীপের দখলদারিত্বের বিরোধের ব্যাপারেও তিনি চীনকে অভিযুক্ত করেন। উল্লেখ্য, আলোচ্য দ্বীপ লইয়া দুই প্রতিবেশীর মনোমালিন্য বহু দিনের। কিন্তু গত দুই বত্সর ধরিয়া বিষয়টি প্রকট হইয়া উঠিয়াছে। এই সময়কালে দ্বীপের আশপাশে উভয়পক্ষের আধা-সামরিক জলযান পরস্পরের বিরুদ্ধে মহড়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটিয়াছে। জাপান গত কিছু দিন ধরিয়াই প্রধান মিত্র ও প্রধান নিরাপত্তাদাতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তির নিকট হইতে পোক্ত আশ্বাস বার্তা আশা করিয়া আসিতেছিল। ওবামার ঘোষণায় এক্ষণে টোকিও কিঞ্চিত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিতে পারিবে বৈকি। কিন্তু তাহা সমস্যার সমাধান হইবে কি? ওবামার এইবারের সফরকে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়ায় অবস্থান বৃদ্ধি এবং মিত্রদের মনোবল বাড়াইবার একটি প্রচেষ্টা হিসাবেই দেখা হইতেছে। বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণ হইতে চলা অঞ্চলটিতে অবস্থান বাড়াইবার চেষ্টার মধ্যে অবাক হইবার কিছুই নাই। কিন্তু ইহার সঙ্গে সঙ্গে যেইভাবে জাপানের স্বার্থে চীনের বিপক্ষে কথাবার্তা বলা হইতেছে তাহা বিশেষজ্ঞদের অনেকে ভ্রূ কুঞ্চিত করিতেছেন বৈকি। ইহাতে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হইবার দিকে অগ্রসর হইতে থাকা চীনের কি আরও বিরাগভাজন হইবে না যুক্তরাষ্ট্র? আর চীনইবা বিষয়টিকে কিভাবে লইতেছে? এইগুলিই হইতেছে এই সময়ের প্রশ্ন। চীন-জাপান বিরোধ প্রসঙ্গে ওবামা বলিয়াছেন যে, “বিরোধের মীমাংসা হইতে হইবে সংলাপে, উসকানি কিংবা সংঘাতে নহে”। কিন্তু চীন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে উসকানির দেখা পাইতেছে বলিয়া জানাইয়া দিয়াছে। বিশেষ করিয়া দ্বীপ লইয়া বিরোধকে দ্বি-পাক্ষিক হিসাবে চিহ্নিত করিয়া ইহার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধকালীন জাপান-ইউএস চুক্তির বরাত দেওয়ার ঘোর প্রতিবাদ করিয়াছে চীন। এই প্রসঙ্গে, বিবাদের উত্স দ্বীপটিকে নিজেদের দাবি করিয়া, এই “বাস্তব তথ্যের” প্রতি সম্মান দেখাইবার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছে এশিয়ার প্রভাবশালী এই দেশটি। দ্বীপ লইয়া চীন-জাপান বিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে ঘিরিয়া উক্ত অঞ্চল তথা বিশ্ব রাজনীতিতে নূতন করিয়া আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছে। ইহার শেষ কোথায় তাহাই এখন দেখিবার বিষয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন