ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি চক্রের সহিত জড়িত থাকিবার অভিযোগে সম্প্রতি রাজধানীতে দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। ওই সময় তাহাদের নিকট হইতে ৫৩ হাজার ১০০টি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, বিভিন্ন ব্যক্তির ৩৬ হাজার ৩০০ রঙিন ছবি ও পরিচয়পত্র তৈরিতে ব্যবহার করা একটি কম্পিউটার উদ্ধার করা হইয়াছে। পুলিশ জানাইয়াছে, অপরাধীরা মোবাইলের সিম ক্রয় করিতে এইসব ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করিয়া থাকে। এই চক্রটি গত দেড় মাস ধরিয়া কাজ করিতেছিল। জাতীয় পরিচয়পত্রগুলি সাধারণত ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি করা হইতো। আটক হওয়া ব্যক্তি এই চক্রটির অন্যতম সদস্য।
জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরিয়া প্রবর্তিত হইলেও জাতীয় পরিচয়পত্র এখন গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হইয়া উঠিয়াছে। যেইকোনো সরকারি কাজে এবং কিছু কিছু বেসরকারি কাজে (যেমন মোবাইল ফোনের জন্য সিমকার্ড ক্রয়) জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হইয়া পড়ে। আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ একটি মৌলিক কার্য সাধন করিয়াছে—দেশের নাগরিকবৃন্দের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ প্রস্তুত হইয়াছে এবং সকল নাগরিকের রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানের অনেক বাধা দূর হইয়াছে। পাশাপাশি অপরাধ দূরীকরণেও এই ডাটাবেজ কাজে লাগিবে। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, এই ধরনের পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়া আসলে ব্যক্তির উপরে রাষ্ট্রের আধিপত্য ও নজরদারি জোরদার হয়। বিশেষত ব্যক্তি যেন আর পুরাপুরি স্বাধীন নহে, রাষ্ট্রের সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে সে বন্দী। এই ভিন্নমতকে মানিয়া লইয়াও বলিতে হইবে যে, প্রত্যেক নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র আধুনিক বিশ্বে একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা। এমনকি বাংলাদেশে উহার গুরুত্ব বাড়িয়া গিয়া এমন এক স্থানে গিয়া পৌঁছাইয়াছে যে, নকল পরিচয়পত্র তৈরির ব্যবসাও জমিয়া উঠিয়াছে। ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি চক্রের দুই সদস্য ও অর্ধলক্ষেরও বেশি ভুয়া পরিচয়পত্র পাকড়াও করিবার মধ্য দিয়া আসলে একটি জরুরি বিষয় আমাদের গোচরীভূত হইয়াছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুতের কাজটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। কারণ প্রতিনিয়তই প্রাপ্তবয়ষ্কের দলে নাম লেখাইতেছেন বিপুলসংখ্যক তরুণসমাজ। তাহাদের জন্য নূতন পরিচয়পত্র তৈয়ার করিবার কাজটি যেমন রহিয়াছে, তেমনি পরিচয়পত্র নবায়ন বা হালনাগাদের কাজটিও থাকিতেছে। বিশেষত শহরাঞ্চলে অনেকেরই অস্থায়ী আবাস পরিবর্তিত হইতেছে, চাকুরীর সূত্রেও ঠিকানা পরিবর্তিত হইতেছে অনেকের। পরিচয়পত্র হারাইয়া গেলেও নূতন করিয়া পরিচয়পত্র তৈরির ব্যাপার রহিয়াছে। এই সবক্ষেত্রেই নূতন বা নবায়িত পরিচয়পত্রের জন্য নাগরিকদের যাইতে হয় নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার মানুষদের জন্যও একই ব্যবস্থা। ইহা এক অস্বাভাবিক ব্যবস্থা। ঢাকার বাহিরের একজন মানুষের জন্য ইহা মূলত: ভোগান্তির নামান্তর। এই বিষয়গুলি অনেক সহজ হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত জেলায় জেলায় পরিচয়পত্র নবায়ন অথবা নূতন পরিচয়পত্র পাইবার সুযোগ থাকা উচিত। পাশাপাশি অনলাইনে এই কাজগুলি সমাধা করিবার সুযোগও থাকা উচিত। চলতি বত্সরে আয়করের জন্য টিআইএন সার্টিফিকেট নাগরিকেরা অনলাইন হইতেই সংগ্রহ করিয়াছেন। পরিচয়পত্র কেবল বত্সরে একবার নহে, বারবার কাজে লাগে। তাই ইহার ক্ষেত্রে এই সুযোগটি অবশ্যই জনবান্ধব করিবার প্রয়োজন রহিয়াছে। এমন হইতে পারে, ঠিকানা পরিবর্তন বা তথ্য হালনাগাদকরণের কাজটি নাগরিক অনলাইনে আবেদন করিয়া রাখিলেন। পরিচয়পত্র প্রস্তুত হইবার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাহাকে এসএমএস-এর মাধ্যমে একটি তারিখ দিবেন পরিচয়পত্রটি সংগ্রহ করিবার জন্য। এইভাবে পুরা প্রক্রিয়াটি সহজ করা যাইতে পারে। অথবা ইহার চাইতে ভিন্ন কোনো উপায়েও কাজটি করা যাইতে পারে। আমরা আশা করিব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলি নিয়া গভীরভাবে ভাবিবেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন।
