সাম্প্রদায়িকতা ও সামরিক বাহিনীকে উস্কানি দানের রাজনীতি

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪১
প্রাচীন কালের লঙ্কান রাজা রাবনকে বলা হতো দশানন। অর্থাত্ যার দশমুখ। আধুনিক ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি’র সাম্প্রতিক নির্বাচনী রাজনীতিকে কেউ কেউ দশানন-রাজনীতি আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাত্ বিজেপি যেকোনোভাবে নির্বাচনে জেতার আশায় দশমুখে দশরকম কথা বলতে শুরু করেছে। এক মুখে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোট লাভের আশায় কট্টর হিন্দুত্ববাদ প্রচার করছে। শুধু গোটা কাশ্মীর দখল করা নয়, বাংলাদেশের কিছু ভূখণ্ড দাবি করা হয়েছে ভারতে শরণার্থী হিন্দু পরিবারদের বসতি স্থাপনের অজুহাতে। আবার ভারতের মুসলিম ভোট পাওয়ার আশায় বিজেপি’র সভাপতি রাজনাথ সিং তাদের উদ্দেশে বলেছেন, “আমি আমার মাথা নিচু করে আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব” (আপনা শির ঝুককের হাম ক্ষমা মাঙ্গেঙ্গে)। এটা সেই মার্চ মাসেরও আগের কথা। ভারতের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের পক্ষ থেকে বিজেপি’র প্রবীণ নেতা অরুণ জেটলিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মুসলমানদের কাছে নির্বাচনের আগে এই ক্ষমা প্রার্থনার অর্থ কি? জেটলি স্বীকার করেছিলেন, “ভোটের আগে মুসলিম সম্প্রদায়ের মন পেতে চাইছে ভারতীয় জনতা পার্টি। বিজেপি যদি মুসলমানদের কাছে কিছু ভুল করে থাকে, তার জন্য নত মস্তকে ক্ষমা চেয়ে নেবে। এই ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই।” রাজনাথ সিং বা অরুণ জেটলির বক্তব্যে মোটেই খুশি হয়নি বিজেপি’র উগ্র হিন্দুত্ববাদী সহযোগী অংশ শিবসেনা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। সিং ও জেটলির বক্তব্যে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, নরেন্দ্র মোদীর সবচেয়ে বড় সমর্থক রাজনাথ সিং নির্বাচনে মুসলিম ভোট পাওয়ার আশায় এই “দুঃখ প্রকাশের” তামাশা করছেন। বাবরি মসজিদ ভাঙা (১৯৯২) এবং গুজরাটে দাঙ্গা বাধিয়ে দুই হাজারের বেশি সংখ্যালঘু নিধনের (২০০২) এতো দীর্ঘদিন পর কিছু ভুল করার এই “দুঃখ প্রকাশ” ভোট পাওয়ার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। তাতেও বিজেপি’র উগ্রপন্থিরা (যারা নরেন্দ্র মোদীর শক্তির আসল উত্স) বেজায় চটে ছিলেন। নাগপুরে স্বয়ংসেবক সংঘের হেড কোয়ার্টারে তা নিয়ে রীতিমতো অসন্তোষের ঝড় বয়। ফলে রাজনাথ সিংয়ের দুঃখ প্রকাশের একটা নতুন ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল। কলকাতায় দৈনিক স্টেটসম্যানের ভাষায়—“রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্য সংশোধন করে আরএসএসের চাপে যে বয়ান জারি করা হলো, তা তার দুঃখ প্রকাশের বক্তব্যের খণ্ড নয়, ক্ষীণ সংশোধনী মাত্র। গুজরাট দাঙ্গার ১২ বছর পর হিসেব করে লোকসভা ভোটের আগে মুসলিমদের কাছে দুঃখ প্রকাশ আসলে যে বিজেপি’র একটা নির্বাচনী কৌশল সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেহেতু আরএসএস একটি কট্টরপন্থী সংগঠন এবং সংঘ পরিবারের মুরব্বি, তাই বিজেপি’র এই নরম অবস্থান সম্পর্কে তারা আপত্তি তুলেছে, যেমন করাচিতে এল, কে আদভানীর মহম্মদ আলী জিন্না সম্পর্কে প্রশংসামূলক মন্তব্যে তারা আপত্তি জানিয়েছিল ২০০৬ সালে।” ভারতের মুসলমানদের কাছে দুঃখ প্রকাশের বয়ান বদল করে এখন বলা হচ্ছে, রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্য সংবাদপত্রে ভুল রিপোর্টিং করা হয়েছে। রাজনাথ সিং আসলে বলতে চেয়েছেন “মুসলমানদের প্রতি যদি ভবিষ্যতে কোনো ভুল-ভ্রান্তি করা হয়, তাহলে তিনি আগাম দুঃখ প্রকাশ করছেন। এটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙা এবং ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় নেতৃত্ব দেয়ার পেছনে বিজেপি’র উদ্দেশ্যই ছিল নির্বাচনের আগে দেশে সাম্প্রদায়িকতার ঝড় বইয়ে দিয়ে জয়লাভ করা। এবার নির্বাচনের আগে দৃশ্যপট একটু বদলেছে। বাংলাদেশের জামায়াতের মতো ভারতের বিজেপি’র উগ্র ধর্মান্ধতার চেহারাটা এখন প্রকট। ভারতের মুসলমানেরাও এখন তার বিরুদ্ধে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ। তাই বিজেপি তার বাঘদন্ত লুকিয়ে মুসলমানদের কাছে নিরীহ মেষশাবক সাজতে চাইছে। এটা তার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার কার্ডেরই উল্টো পিঠ মাত্র। এটা গেল ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি’র দশানন-রাজনীতির একটা চেহারা মাত্র। আরেকটি চেহারা আরও ভয়ানক। সেটি এই সর্ববৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীকে টেনে আনার চেষ্টা এবং সামরিক বাহিনীকে দেশের বর্তমান নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত রাজনৈতিক উসকানি প্রদান। উপমহাদেশের তিনটি প্রধান দেশ— ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ভারতেই কখনো সামরিক অভ্যুত্থানের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং চেষ্টা হয়েছে বলেও জানা যায়নি। স্বাধীনতা লাভের পর প্রায় সাত দশক ধরে ভারতের সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি আনুগত্যের অনুকরণীয় নজির স্থাপন করেছে এবং বিশ্বের সর্বত্রই এই ধারণা জেন্মেছে, ভারতে গণতন্ত্র স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে। ভারতের এই স্থিতিশীল গণতন্ত্র তার প্রতিবেশী দেশগুলোর গণতন্ত্রের জন্যও একটি রক্ষাপ্রাচীরের মতো। এই অবস্থায় মাত্র গত বছরেই ভারতে সেনা অভ্যুত্থানের একটা গুঞ্জন সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। অচিরেই এই গুঞ্জনটির পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়েছিল। কিন্তু গুঞ্জন থামলেও সন্দেহটি রয়ে যায় স্থল সেনাপ্রধান জেনারেল ভি,কে, সিংয়ের বক্তব্য ও কার্যকলাপ দেখে। নিজের অবসর গ্রহণের বয়স নিয়ে তিনি কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিবাদে লিপ্ত হন। কংগ্রেস সরকার সেনাবাহিনীকে উপেক্ষা করছে বলে অভিযোগ তোলেন এবং সরকারের সঙ্গে মামলা মোকদ্দমায় জড়িত হন। দিল্লির কংগ্রেস সরকার যখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত, তখন তিনি কট্টর চীন বিরোধী মন্তব্য দ্বারা সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করেন। তখনই সন্দেহ করা হয়েছিল, তিনি বিজেপি’র অনুরাগী, ভারতীয় সেনাবাহিনী যে দল নিরপেক্ষতার জন্য প্রশংসিত, তিনি তাতে চিড় ধরাবার চেষ্টা করছেন। অনেকটা বাংলাদেশে বিএনপি’র আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি থাকাকালে লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমানের আচরণের মতো তিনি প্যালেস ক্লিকে অংশ নিয়ে যেভাবে দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে রাষ্ট্রপতির সহযোগে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা ঘটান এবং সেনা প্রধানকে সরিয়ে নিজে সেনা প্রধান হন, তখনই তার দলীয় আনুগত্য সম্পর্কে বাজারে গুজব রটেছিল। সেনা প্রধানের পদ থেকে অবসর গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি’তে যোগ দিয়ে তিনি সেই গুজবের সত্যতা প্রমাণ করেন। ভারতে জেনারেল ভি.কে.সিং সেনাবাহিনীতে থাকাকালেই কংগ্রেস সরকারের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করতে শুরু করেন। বিজেপির চীন সম্পর্কিত নীতির সঙ্গে তার দারুণ সহমত। বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীও নির্বাচনী প্রচার কার্যে অরুণাচলে গিয়ে চীনকে প্রতিহত করা হবে বলে ধমক দিয়েছেন। চীনও তার ধমকের জবাব দিয়েছে। অর্থাত্ চীন সম্পর্কে নরেন্দ্র মোদী ও জেনারেল সিং অভিন্ন মত পোষণ করেন। তার সম্পর্কেও গুজব রটেছিল, সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে তিনি বিজেপি’তে যোগ দেবেন। গত মার্চ মাসেই এই গুজবের সত্যতা প্রমাণ করে জেনারেল সিং শুধু একা নন, সেনাবাহিনীর আরও কয়েকজন তারই মতো অবসর গ্রহণকারী সেনা অফিসার সহকর্মী নিয়ে বিজেপি’তে যোগ দিয়েছেন এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছেন। এই প্রচারের মধ্যে রয়েছে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে উপেক্ষা করা, তাদের স্বার্থ, অধিকার রক্ষা না করা, দেশরক্ষা ব্যবস্থাকে গুরুত্ব না দেয়া ইত্যাদি অভিযোগ। যেসব অভিযোগ সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ ও সরকার বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে বলে ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের এই শঙ্কা সঠিক হলে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য কতিপয় প্রাক্তন ভারতীয় জেনারেলের ভূমিকা গভীর বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিজেপি’তে যোগ দিয়ে জেনারেল ভি.কে.সিং বলেছেন, “জনতা পার্টিই একমাত্র দল যাদের জাতীয়তা বোধ (হিন্দু জাতীয়তা) রয়েছে। সে কারণে আমরা কয়েকজন বিজেপি’তে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমরা চাই বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করুক।” ভি.কে.সিংসহ কয়েকজন জেনারেল বিজেপি’তে যোগ দেয়ায় দলের সভাপতি রাজনাথ সিং খুশি হয়ে বলেছেন, “বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভারতের সেনাবাহিনীর প্রতি উপেক্ষার নীতি বদলাবে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করবে। দিল্লির একটি সাময়িকী এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, একদিকে মুসলমানদের কাছে দুঃখপ্রকাশ এবং অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর নাকের সামনে প্রলোভনের মূলো ঝোলানো এই দু’টি কৌশল হচ্ছে বিজেপি’র প্রধান নির্বাচন-স্ট্রাটেজি। বিজেপি রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও কট্টর হিন্দুত্ববাদের তাস খেলছে। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীতেও তাদের পক্ষে রাজনৈতিক আনুগত্য সৃষ্টির খেলায় মেতেছে। দু’টি খেলাই ভারতের গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।’ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে রাজনৈতিক দলে যোগদান; এমনকি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা পৃথিবীতে কোনো বিরল ঘটনা নয়। আমেরিকায় জেনারেল আইসেন হাওয়ার ন্যাটোর সেনাপ্রধান পদে ইস্তফা দিয়ে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিতও হন। তিনি সাবেক ডেমোক্রাট সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ সৃষ্টি অথবা দলবল নিয়ে একটি কট্টর গণতন্ত্র বিরোধী দলে যোগ দিয়ে দেশের গণতন্ত্রের জন্য শঙ্কা সৃষ্টি করেননি। ভারতে জেনারেল ভি.কে.সিং সেনাবাহিনীতে থাকাকালেই কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা শুরু করেন এবং অবসর নেয়ার পর তার সেনা সহকর্মীদের নিয়ে বিজেপি’তে যোগ দিয়েছেন। যে দলটির নীতি এবং নেতৃত্ব উগ্র সাম্প্রদায়িকতার রঙে রঞ্জিত। যে দলটি ভারতে ক্ষমতায় গেলে প্রতিবেশী দেশগুলোরও চিন্তিত হওয়ার কারণ রয়েছে। ভারতের নির্বাচনে বিজেপি’র জয়লাভের সম্ভাবনাতে বাংলাদেশের বিএনপিও নাকি উল্লসিত। বাংলাদেশে এই দলটির গায়েও সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ আছে এবং জামায়াতসহ উগ্র ধর্মান্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো এই দলের সমর্থক ও সহযোগী। অন্যদিকে পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন নওয়াজ শরিফের মুসলিম লীগ দলও ভারতে বিজেপি’র নির্বাচন-জয় হোক তা কামনা করে। দিল্লিতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার দু’দিন আগে ঘোষণা করেছেন, বিজেপি’র ঘোষিত পররাষ্ট্র নীতির তারা সমর্থক এবং নির্বাচনে বিজেপি’র জয়লাভ সম্পর্কে তারা আশাবাদী। তাহলে সারা উপ-মহাদেশেই কি সার্বিকভাবে একটি সেক্যুলারিজম বিরোধী অক্সিস তৈরি হতে যাচ্ছে এবং বিজেপি দিল্লিতে ক্ষমতা দখল করলে সর্বত্র তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাবে অথবা স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব বিস্তৃত হবে? এই ভবিষ্যত্ আশঙ্কার ব্যাপারটি কতোটা বাস্তব তা আমি জানি না, কিন্তু উপ-মহাদেশের গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলারিস্ট সকল মহলের তা ভেবে দেখা উচিত এবং এর প্রতীক্ষার পন্থার কথাও ভাবা দরকার। ধর্মান্ধতা ও সামরিক তন্ত্রের সমবায়ে ত্রিশের দশকের ইউরোপে ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান আমাদের স্মরণে রাখা উচিত। [লন্ডন, ২৬ এপ্রিল, শনিবার, ২০১৪]