আলোকপাত

ছাপা ‘অক্সফোর্ড ইডি’র দিন ফুরালো যে কারণে

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৩
ফিসফাস করে শোনা যাচ্ছিল কয়েক দিন ধরেই। গত সপ্তাহে সেটাই স্পষ্ট করে শোনা গেল। এই বিশ্বের সব থেকে বেশি প্রচারিত এবং জনপ্রিয় অভিধান ‘অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’ (ওইডি)-এর পরিবর্ধিত এবং পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণের মুদ্রিত সংস্করণটা আর হাতে পাবে না মানুষ। যা পাওয়া যাবে তা হল, ই-ভার্সন, অর্থাত্ ইন্টারনেট সংস্করণ। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তের কারণ কী? ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখা যাক। ১৯৮৯ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি-২ প্রকাশিত হওয়ার পর এই তৃতীয় সংস্করণটি’র জন্য কাজ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। তারপর টেমস নদী দিয়ে কলকল রব তুলে বয়ে গেছে অনেক জল, ক্যালেন্ডারের হিসেবে পেরিয়ে গেছে বিশটি বছর, কিন্তু সেই সংস্করণের কাজ শেষ হয়নি এখনও। গত বিশ বছর ধরে সত্তর জনের যে দলটি কাজ করে চলেছেন অক্লান্তভাবে, সেই দলের প্রধান তথা ওইডি (অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি) প্রধান সম্পাদক মাইকেল প্রফিট জানিয়েছেন, চল্লি¬শ খণ্ডের কাজটি শেষ করতে সময় লাগবে কমপক্ষে আরও বিশটি বছর। অর্থাত্, গোটা কাজ শেষ হয়ে ডিকশনারি প্রকাশিত হতে হতে লেগে যাবে কমপক্ষে ২০৩৪ সাল। বড় কাজে বড় সময় লাগতে পারে বটে, যে কোনো মহত্ এবং সৃষ্টিশীল কাজের পেছনেই অনেকটা করে সময় দেওয়াও জরুরি বটে। তার ওপর এই পরাক্রমশালী ঐতিহ্যবাহী ডিকশনারির পাতায় পাতায় বিদ্যমান ব্রিটিশ আভিজাত্য ও সংস্কৃতির গঠনমূলক সহাবস্থান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দুটো সমস্যা গুরুতর হয়ে ওঠে। প্রথমত, সেকেন্ডের মধ্যে কাওয়ার চর থেকে চিলি পর্যন্ত যোগাযোগ করতে পারা’র এই যুগে একটা ডিকশনারির পরিমার্জন এবং পরিবর্ধনের জন্য চল্লিশটা বছর সময় নেওয়া খুব কিছু কাজের কথা নয়। ঐতিহ্যের পতাকা উড়িয়েও নয়। তার ওপর প্রফিট বলছেন যে, একেবারে ২০৩৪ সালেই যে হবে তা এখনও থেকে হলফ করে বলা যাচ্ছে না। আরও বাড়তি কয়েক বছর সময় লেগেই যেতে পারে। যদিও এই প্রেক্ষিতে অক্সফোর্ড ডিকশনারির ইতিহাস ঘাঁটলে উঠে আসবে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সংস্করণের পরিমার্জনের ক্ষেত্রে বরাবরই বিপুল বিলম্বের সাক্ষী এই ডিকশনারি। প্রসঙ্গত, ১৮৫৮ সালে এই ডিকশনারির তৈরির সময় ধরা হয়েছিল দশ বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ হবে গোটা কাজ। যা আদতে সম্পূর্ণ হতে সময় লেগেছিল ৭০টি বছর। দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়েই ভাষার বিরাট হাঁড়িতে নিরন্তর তৈরি হয়ে চলেছে গরম খিচুড়ি। সেই ভাষার খিচুড়ি কতটা উন্নত, তা বলার সময় আসেনি যদিও এখনও। কিন্তু ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসাবে একটি ডিকশনারি যে সেই খিচুড়ির সুবাস এবং মশলার হাত থেকে নিজের মোটা মলাটটিকে বাঁচিয়ে চলতে পারে না, তা অনুধাবন করা কষ্টকর নয়। ’৮৯ থেকে ২০১৪, এই পঁচিশ বছরে এসএমএস কিংবা সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে স্ট্যাটাস কমেন্ট লাইকে চরম ঘ্যাঁটঘোঁট একজোট করলে খিচুড়ি ভাষার সংখ্যাই গিয়ে পৌঁছবে কয়েক হাজারে। ঘটনা হল, এই সমস্ত নতুন এন্ট্রি করানোর পর এমনিতেই প্রায় দৈত্যকার ডিকশনারিটির বিশ বছর পর গিয়ে যে বিশালাকায় ও অকল্পনীয় সাইজ হবে তা সে যুগের সমস্ত রকম পাঠ্যবস্তুর সঙ্গেই বেমানান হয়ে উঠবে নিশ্চিতভাবেই। এত কিছু ভেবেই এই সিদ্ধান্ত। একদল মানুষ এতে খুশি হবেন না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ই-নির্ভর যুগে ‘বই’ বা ওই ধরনের জিনিসপত্র যে দিন দিন বিলুপ্ত প্রজাতির লাল তালিকায় ঢুকে পড়ছে, তা প্রতিহত করার কোনো উপায় নেই। যুগের ধর্ম এমনই ভয়ঙ্কর হয়। এখন অনলাইনে কোনো একটা শব্দ লিখে ক্লিক করলেই অনেক সহজেই মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে পড়ে তার সমস্ত নাড়ি নক্ষত্র, সেখানে ডিকশনারি জিনিসটা আস্তে আস্তে পেপার ওয়েট ছাড়া আর কোনো কাজে লাগবে কিনা—এমন সংশয়ও প্রকাশ করেন অনেকে। লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন