জাপান সফর দিয়ে শুরু হয়েছে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এশিয়া সফর। এবার তিনি এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপিন্স সফর করছেন (বর্তমানে তিনি অবস্থান করছেন মালয়েশিয়ায়)। মূলত গত বছরই এই সফর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গভর্নমেন্ট শাটডাউনসহ অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে তা শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়। এখন বারাক ওবামার এতদঞ্চলে প্রত্যাবর্তন মিত্র দেশগুলোকে পুনরায় আশ্বস্ত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির এই উপস্থিতিতে প্রমাণিত হয়, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে এশিয়া গুরুত্ব পাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন দু’বছর আগেই এই সফরের কথা ঘোষণা করে। এই সফর সফল করতে তাই বেগ পেতে হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে বারাক ওবামা পঞ্চমবারের ন্যায় এশিয়া সফর করছেন। এশিয়ায় কী কী চ্যালেঞ্জ তাকে মোকাবিলা করতে হবে, এই সফর থেকে তিনি কী প্রত্যাশা করছেন এবং এতদঞ্চলের মানুষ তার নিকট থেকে কোন্ বার্তাটা শুনতে চান তার সফর উপলক্ষে এই প্রশ্নগুলো সামনে চলে এসেছে। তিনি এমন এক অঞ্চল সফর করছেন যা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বিপর্যস্ত। সেই দেশের নাগরিকগণ উদ্বিগ্ন। ভবিষ্যত্ তাদের অনিশ্চিত। তন্মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার অবস্থা অধিক শোচনীয়। এই দেশ দুটি তাত্পর্যপূর্ণ ট্রাজেডি দ্বারা আক্রান্ত। সমপ্রতি দক্ষিণ কোরিয়ান একটি জাহাজ ডুবে তিন শতাধিক ব্যক্তির সলিল সমাধি হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই হাইস্কুলের শিক্ষার্থী।
অন্যদিকে সমপ্রতিকালে মালয়েশিয়ার চীনগামী একটি বিমান নিখোঁজ হয়। বিমানটিতে ছিল ২৩৯ জন যাত্রী ও নাবিক। কিন্তু তাদের ভাগ্য সম্পর্কে আজও কিছু জানা যায়নি। তবে বহুজাতিক অনুসন্ধান এখনও অব্যাহত আছে। মালয়েশিয়ার সরকার এজন্য আঞ্চলিক সমালোচনার মুখে পড়েছে। কেননা যাত্রীদের অধিকাংশই চীনা নাগরিক। যদিও সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মালয়েশিয়া সফরে আছেন ওবামা, তবু এর ফলে বিষয়টির মোড় পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে নিঃসন্দেহে। উল্লেখ্য, গত ৫০ বছরে মালয়েশিয়ায় কোন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম সফর।
ওবামার এশিয়া সফরের আরেকটি দেশ ফিলিপিন্স। গত বছরের নভেম্বরে দেশটিতে স্মরণাতীতকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এর ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশটি। এই টাইফুন বা প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ে ছয় হাজারেরও বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটে। এতে বাস্তুহারা হয় ৪০ লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজ এখনও শেষ হয়নি। তাই ওবামার এই সফরের অন্যতম এজেন্ডা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবিক ত্রাণ সহায়তায় বৃহত্ আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রদান করা।
এশিয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া আমেরিকার দুই প্রধান মিত্র দেশ। কিন্তু দেশ দুটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কলহ বিদ্যমান। প্রেসিডেন্ট ওবামা গত মাসে নেদারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত পারমাণবিক সম্মেলনের সময় জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক জিউন হাইয়ের সাথে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তিনি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এভাবে এ ব্যাপারে উঁচু পর্যায়ের সংলাপ পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করেন। সাধারণত এ ধরনের সফরের সময় বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উত্তর কোরিয়া উপর্যুপরি উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করে। বারাক ওবামা ইতোমধ্যে জাপান সফর শেষ করেছেন। টোকিওতে অবস্থানকালে তিনি এই অঞ্চলে জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিস্তারে দেশটির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে পর্যালোচনা করেন। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল গমন করেন। সেখানে অবস্থানকালে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কেন প্রয়োজন তা পিয়ংইয়ংয়ের আচরণেই সুস্পষ্ট।
বারাক ওবামার এশিয়া সফরে এবার চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কিন্তু এই সফরের পটভূমিতে আছে বেইজিং। প্রতিটি পদক্ষেপে ওবামা কী বলেন তা বেইজিং মনোযোগ সহকারে শুনছে।
এশিয়ার মিত্র দেশগুলো ভূ-খণ্ডগত বিরোধ নিয়ে জেদী মনোভাব পোষণকারী চীনের বিপরীতে ভারসাম্য রক্ষার জন্য আমেরিকার সংশ্লিষ্টতাকে নতুন করে স্বাগত জানাচ্ছে। তিনি যেসব দেশ সফর করছেন তার প্রতিটির সাথে চীনের কোন না কোন প্রকারের ভূ-খণ্ডগত বিরোধ বা বিতর্ক রয়েছে। এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা পেতে চায় যে, যদি চীন কোনপ্রকার উস্কানিমূলক আচরণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। আগামী ২৮-২৯ এপ্রিল ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলা সফরের মাধ্যমে ওবামার এশিয়া সফরের সমাপ্তি ঘটবে। এখানে অবস্থানকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপিন্স নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর ঘোষণা দেবে। এর মধ্যে ফিলিপিন্সের সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আবর্তিত করানো বা পালাক্রমে রাখার বন্দোবস্ত অন্তর্ভুক্ত হবে।
এই এশিয়া সফরের মাধ্যমে বারাক ওবামা ভারসাম্যতাও বজায় রাখছেন। চীনের প্রসঙ্গ না টেনেই এই অঞ্চলে আমেরিকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছেন এবং নিরাপত্তা সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। মূলত তিনি এটাই বুঝাতে চাচ্ছেন যে, ওয়াশিংটনের আসল নীতি হল এতদঞ্চলে যেকোন নতুন রাষ্ট্রের প্রভাব বা প্রভাব-সীমার বিস্তার রোধ করা। নতুন করে কোন রাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা চুক্তিতে জড়িয়ে পড়া নয়।
প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন এশিয়া সফর করছেন, তখনও তিনি ইউরোপের দেশ ইউক্রেনে চলমান সংকটের ওপর তীক্ষ দৃষ্টি রাখছেন। সারা বিশ্ব তো বটে, এমনকি আমেরিকার মিত্ররাও ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক অঙ্গীকারগুলো বিচার ও মূল্যায়নের চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে ওবামারও যে নিজস্ব প্রশ্ন নেই তা নয়। যেমন যদি রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনে আক্রমণ চালায়, তাহলে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার ওপর অর্থবহ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে প্রস্তুত আছে কিনা তা জানার ব্যাপারেও ওবামার আগ্রহ আছে। এশিয়া সফরের এটাও একটি উপলক্ষ বটে।
তবে নিরাপত্তার পাশাপাশি ওবামার সফরের এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত আছে বাণিজ্যও। জাপান ও মালয়েশিয়া ট্রান্স প্যাসেফিক পার্টনারশিপ বা টিটিপিতে নিযুক্ত আছে। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপিন্স সংযুক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জাপানি কৃষিপণ্য ও জাপানের বাজারে মার্কিন অটোমোবাইল বা মোটর গাড়ির অবাধ প্রবেশ ইস্যুতেও টোকিওতে সফল আলোচনা হয়েছে। যেখানে আমেরিকার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি সফর করছেন, সেখানে উল্লেখিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক উপকার ভোগের নীতিতে বিশ্বাসী।
বিবিসি থেকে ভাষান্তর : ফাইজুল ইসলাম
লেখক : ওবামা প্রশাসনের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমানে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড গ্লোবাল কমিউনিকেশনের ফেলো।
