দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিত্ব রুখতে পারেনি যাদের

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১১
দৃষ্টিশক্তি হারালেই জীবন থমকে যায় না। মানব শরীরের অন্য ৪ ইন্দ্রিয়- নাক, কান, জিহবা ও ত্বক চোখের ঘাটতি পূরণে মানুষকে সহায়তা করে থাকে। ঘ্রাণ, শ্রবণ, স্পর্শ ও স্বাদ আস্বাদন ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দৃষ্টিহীন মানুষ জীবনের চড়াই-উত্রাইগুলো ঠিকই পেরিয়ে যায়। আর জীবনে চলার পথে নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতেও সক্ষম হন অনেকে। তাইতো যুগে যুগে আবির্ভাব ঘটেছে হোমার, জন মিল্টন, হেলেন কেলার, স্টিভ ওয়ান্ডারসহ অগণিত প্রতিভাবানদের। অন্ধত্ব তাদের প্রতিভা বিকাশের পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। এমনই কয়েকজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর কথা আজ তুলে ধরা হলো যারা বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সার্ফার সাগরে সার্ফিং করা দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষেই যেখানে অত্যন্ত কঠিন, সেখানে একজন অন্ধের পক্ষে সার্ফিং-এর কথা কি ভাবা যায়? এই বিস্ময়কর কাজটিই করে দেখিয়েছেন ব্রাজিলের ২০ বছর বয়সী যুবক ডেরেক র্যাবেলো। জন্ম থেকেই গ্লুকোমা রোগে আক্রান্ত ডেরেক তিন বছর বয়সে হাতেখড়ি নেন সার্ফিং-এ। বর্তমানে একজন দক্ষ সার্ফার হিসেবেই সকলে তাকে চেনে। ডেরেকের মতে- ‘ঈশ্বরের সাহায্য থাকলে, সবই সম্ভব।’ বর্তমান পর্যায়ে আসতে ধর্ম তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং একজন দক্ষ সার্ফার হতে তার চার্চ তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে বলে জানান ডেরেক। এই বিস্ময়কর অন্ধ সার্ফারের জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘বিয়ন্ড সাইট’ নামক একটি প্রামাণ্য চিত্রও। রাঁধুনি যখন কিছুই দেখেন না ভাল রান্নাবান্নার বিষয়টি মূলত রাধুনির খাবারের স্বাদ ও গন্ধ বোঝার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে যেটা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের তুলনামূলকভাবে বেশিই আছে। ফলে রান্নাবান্নার ক্ষেত্রে এসব রাঁধুনিরা যথেষ্ট পটু হয়ে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টিন হা তেমনই একজন দক্ষ রাঁধুনি। ২০০৪ সালে তিনি অন্ধ হতে শুরু করেন এবং ২০০৭ সাল নাগাদ দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন ক্রিস্টিন। এক সময়ে তিনি রান্নাবান্নার কাজে মনোনিবেশ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এ কাজে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দেন। ২০১২ সালের মাস্টার শেফ টিভি শোতে সেরা রাঁধুনির পুরস্কার লাভ করেন ক্রিস্টিন। জিতে নেন ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার, মাস্টার শেফের ট্রফি ও একটি রান্নার বই লেখার চুক্তি। দৃষ্টিশক্তিহীন ফটোগ্রাফার পিট একার্ট ছিলেন একজন ভাস্কর। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনের ওপরও তার পড়াশুনা ছিল। তার ইচ্ছা ছিল ইয়েলে আর্কিটেকচারের ওপর পড়াশুনা করার। কিন্তু বিধি বাম। এক কঠিন চোখের অসুখে ভুগে তিনি দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা দমাতে পারে নি প্রবল মনোবলের অধিকারী পিটকে। দৃষ্টিশক্তি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে ফটোগ্রাফিতে, তাতেই কিনা ঝুঁকে পড়লেন তিনি। আর এক্ষেত্রে তিনি কাজে লাগালেন তার এতদিনের সঞ্চিত স্মৃতির ভাণ্ডার এবং শব্দ ও স্পর্শানুভূতি ক্ষমতাকে। তার ম্যামিয়াফ্লেক্স টিএলআর ক্যামেরার মাধ্যমে তুলে ফেললেন প্রচুর ছবি যেগুলো সকলের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়। পিটের ভাষায়- ‘আমি দেখি আমার মানস চোখ দিয়ে।’ দৃষ্টিহীন চিত্রকর ২০০১ সালে ৩০ বছর বয়সে এপিলেপ্সি রোগে দৃষ্টিশক্তি হারান জন ব্র্যামব্লিট। এ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েন জন। জীবনের প্রতি আগ্রহই একরকম হারিয়ে ফেলেন তিনি। এমন এক দুঃসময়ে হঠাত্ করে ছবি আঁকার প্রতি আকৃষ্ট হলেন তিনি এবং খুঁজে পেলেন হতাশা থেকে উত্তরণের পথ। তবে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তিটা যেখানে জরুরি সেখানে অন্ধ জন কি করে করলেন এই দুঃসাধ্য কাজ? এক্ষেত্রে স্পর্শানুভূতি জনকে ছবি আঁকতে সাহায্য করেছে। জনের ভাষ্যমতে তিনি রঙ দেখতে না পারলেও স্পর্শ করে কোন্টা কোন্ রঙ তা তিনি ঠিকই চিনে নিতে পারেন। সাদা রঙ ধরলে তার কাছে ঘন লাগে এবং কালো লাগে মসৃণ। আর দুটো মিশিয়ে সঠিক ধূসর রঙ বের করে নেয়াও তার জন্য কঠিন কিছু নয়। গত এক দশকে জন একজন ভাল চিত্রকর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন, অর্জন করেছেন বেশ কিছু পুরস্কারও। বিশ্বের ২০টি দেশে তার ছবি বিক্রি হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও তার বিস্ময়কর প্রতিভার কথা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে।