বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে জাতীয় নির্বাচন অতিক্রান্ত প্রায়। ৭ এপ্রিল শুরু হওয়া ৯ ধাপের এ নির্বাচন শেষ হবে ২২ মে। ইতোমধ্যে ৫৪৩ আসনবিশিষ্ট লোকসভার গরিষ্ঠ আসনে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৩টি পর্যায় ৩০ এপ্রিল, ৭ মে এবং ১২ মে অনুষ্ঠিত হবে। ফলাফল প্রকাশিত হবে ১৬ মে। সে দেশের ভোটার সংখ্যা ৮১.৪১ কোটি। এসব তথ্য জানিয়েছে ভারতের শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। স্মরণ করা যেতে পারে যে সেখানে তত্ত্বাবধায়ক জাতীয় কোন কিছু নেই। ১৯৪৭ থেকে ২০১৪-এ ৬৭ বছরে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সেখানের সরকার আমাদের সরকারের মত আচরণ করে না। সে যাই হোক, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ভারতকে ছোট ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ মনে করেন। সুতরাং ভারতের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে বাধ্য।
ভারতে মোদি হাওয়া বইছে। প্রাক-নির্বাচনী জরিপ, জনসমাগম এবং সংবাদপত্রের ভাষ্য মোতাবেক বিজেপি জোট সরকার গঠন করার মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। বিগত ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা বা ইউপিএ। মানুষ পরিবর্তন চায়। কংগ্রেসের একদশকের শাসনে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট। দুর্নীতি, দুঃশাসন এবং অর্থনৈতিক দুর্গতির জন্য অভিযুক্ত কংগ্রেস সরকার। সর্বশেষ জনমত জরিপ স্পষ্ট আভাস দিয়েছে ভোটের ফলে পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএ।
আর এ সম্ভাব্য বিজয়ের মধ্যমণি মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গাখ্যাত গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মোদি কিশোরকাল থেকেই ভারতের উগ্র হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ বা আরএসএস-এর সদস্য। সংঘে যোগদানের জন্য তিনি সংসার পরিত্যাগ করেন। চিরকুমার বলে কথিত মোদি এখন স্বীকার করেছেন একসময়ের স্কুলশিক্ষিকা যশোদাবেন তার স্ত্রী। ইদানিং তার এক ভক্ত সংসার ত্যাগী বলে তাকে মহামতি বুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। সবাই জানে বুদ্ধ আজীবন অহিংস জীবনের সাধনা করেছেন। আর মোদি হিংসার সাধনা করেছেন। দু’জনার পাথ্যক্য এটুকু। কিছুকাল আগে গুজরাটে সংঘটিত ভয়াবহ দাঙ্গায় অসংখ্য মুসলমান নিহত হয়। তিনি দাঙ্গা দমনে নিষ্ক্রিয় থাকেন। তৃতীয়বার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দাঙ্গা সম্পর্কে মন্তব্য করতে বললে তিনি বলেন- ‘ধরুন আমি গাড়ি চেপে যাচ্ছি। হঠাত্ আমার গাড়ির চাকায় কুকুরের বাচ্চা চাপা পড়লো। তাহলে কষ্ট তো হবেই।’ এ নির্বাচনে মুসলমানদের কুকুরের সাথে তুলনা করার প্রতিবাদে একজন মুসলিম নেতা আযম খান বলেন, নরেন্দ্র মোদি হলেন ‘কুত্তেকা বাচ্চেকা বড় ভাই।’ কংগ্রেস নেতা বেনি প্রসাদ ভার্মা মন্তব্য করেন, ‘মোদি হলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ আরএসএসএস-এর সবচেয়ে বড় গুণ্ডা। রাজনাথ সিং বিজেপির সভাপতি আছেন তবে তিনি ‘মোদির চাকর।’ সোনিয়া গান্ধী মোদিকে বলেছেন: ‘মৌত কি সওদাগর।’ বা ‘জহের কি খেতি।’ আর ফারুক আব্দুল্লা বলেন, ‘দেশের বিষ।’ শিব সেনা প্রধান ঠাকরে নির্বাচনের পূর্বাহ্নে ঘোষণা দিয়েছেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বিরোধী মুসলমানদের এ দেশে বসবাস করার কোন অধিকার নেই। ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার মন্তব্য করেছেন: ‘মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনায় ভারতীয় মুসলমানরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তিনি আরও বলেন: ধর্ম নিরপেক্ষ সরকারের উপর মুসলমানদের যে বিশ্বাস ছিল তার ভিত্তি নড়ে গেছে, এমন কি তা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করার কথাও ভাবছে না।’ এহেন নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতের ভাগ্য বিধাতা হয়ে ওঠেন তখন বুঝতে হবে তার অন্য কোন গুণাবলি রয়েছে। গুজরাটকে তিনি উন্নয়ন দিয়েছেন। ধর্মীয় ভাবাদর্শে লালিত বলে দুর্নীতির কোন বদনাম তার নেই। তবে তিনি ধর্মীয় উন্মাদনাকে পুঁজি করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠিকে তুষ্ট করেছেন। যেমন: বারানসীতে নির্বাচনী ‘শো ডাউন’ করতে এসে তিনি বলেন: ‘গঙ্গা মা ডাক দিয়েছেন বলেই তিনি বারানসী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার এক ভক্তের উক্তি: মোদি এ যুগের সন্ন্যাসী। তার মধ্যে রয়েছে সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি অনন্ত তাগিদ।’ তার ভক্তের উন্মাদনাও লক্ষ্য করার মত। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বি এইচ গি’র এক নেতা বলেছেন: মোদি ক্ষমতায় এলে ৬ মাসের মধ্যে পাকিস্তান ধ্বংস করে দেবেন।
বাংলাদেশ নিয়েও বিজেপি তথা মোদির বক্তব্য সুখকর নয়। বিজেপি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পাদিত সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের বিরোধিতা করে আসছে। তিস্তার পানি বন্টন প্রশ্নে মমতা ব্যানার্জীর অনুরূপ মন্তব্য তাদের। বাংলাদেশের শংকার আরও কারণ হচ্ছে বিজেপি তার ঘোষিত মেনিফেস্টোতে প্রয়োজনে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের কথা বলেছে। সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আগ্রহের পর শক্তি প্রয়োগের কথা প্রকাশ্য এবং লিখিতভাবে বলার তাত্পর্য রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণাকালে বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেবেন বলে উল্লেখ করেন। এদিকে বিজেপির অন্যতম নেতা সুব্রামনিয়ান স্বামী বলেছেন- বাংলাদেশ যদি তার লোকদের ফেরত নিতে না চায় তাহলে বাংলাদেশকে ঐ লোকদের জন্য ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে। এসব মন্তব্য বাংলাদেশের প্রতি তাদের চরম বিরূপ মনোভাবের প্রমাণ মেলে। এছাড়া ভারতের অভ্যন্তরে যেসব কার্যাবলির কথা বিজেপি নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে তা উপমহাদেশে উত্তেজনা প্রশমনের পরিবর্তে উস্কে দেয়ার মত উদাহরণ হিসেবে অন্তত তিনটি বড় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা যায়। যেমন তারা-
ক. অযোধ্যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরী মসজিদ স্থলে ‘সংবিধান সম্মতভাবে’ মন্দির নির্মাণের কথা বলেছে।
খ. কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপের ঘোষণা দিয়েছে।
গ. মুসলিম পারিবারিক আইন বিলোপ করে সাধারণ আইন প্রণয়নের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে।
এসব মন্তব্য ও কার্যক্রমে ভারতে বিজেপি ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশ স্বস্তিতে থাকবে না বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। বিশেষত ক্ষমতাসীন আওয়ামী মহলে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। বিজেপি যদি সত্যি ক্ষমতাসীন হয় তাহলে আওয়ামী রণ কৌশল কি হবে অথবা কিভাবে ক্ষমতাসীনরা বিজেপির সমর্থন পাবে তা নিয়ে পরামর্শের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী ও পররাষ্ট্র সচিব সহিদুল হক সম্প্রতি দিল্লী সফর করে এসেছেন। তারা এক সংবাদপত্রকে বলেছেন:ক্ষমতার পালাবদল হলেও বর্তমান উষ্ণতা বজায় রাখতে ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা সচেষ্ট থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। এরা কংগ্রেস ও বিজেপির নেতৃত্বের সাথেও বৈঠক করেছেন। দু’দলই তাদের আশ্বস্ত করেছেন বলে পত্র-পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছে। অপর একটি মহল মনে করেন: শত্রুর শত্রু সাধারণত মিত্র হয়। কংগ্রেসের সাথে আওয়ামী লীগের যে বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে তা বিজেপির সাথে সম্ভব হবে না- এটা সহজেই বোধগম্য। তবে গতানুগতিক পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণে জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়; আর তাই যদি হয় তাহলে বিজেপি তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য হয়তো আওয়ামী লীগকেই অগ্রাধিকার দেবে। তার কারণ আওয়ামী লীগের ক্ষমতা কেন্দ্রিকতা এবং জাতীয় স্বার্থের আপোস মনোভাব অন্য যে কোন রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে প্রবল।
ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান বাংলাদেশসহ গোটা উপমহাদেশকে প্রভাবিত করবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও অনুরূপ শক্তির উত্থান বা সম্প্রসারণ ঘটতে পারে। নিউটনের সূত্র মোতাবেক: প্রতিটি কাজেরই সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বীজ গণিতের সূত্র ধরে আবার কেউ কেউ বলেন, মাইনাস এন্ড মাইনাস ইকুয়াল টু প্লাস। আর একটা কথা রিটোরিক্স এন্ড রিয়ালিটি’র মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। নির্বাচনী প্রচারণা ও বাস্তবতা এক নয়। সুতরাং বোঝা যায় যত গর্জে তত বর্ষে না। সত্যিই যদি বিজেপি ক্ষমতাসীন হয় তাহলে ভারত বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ভারত-বিরোধী পক্ষ প্রত্যক্ষ করবে। জাতীয় স্বার্থে নিবেদিত যে কোন জাতীয় সরকার প্রতিপক্ষের জন্য প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সৃষ্টি করে। আর এভাবেই সৃষ্টি হতে পারে ক্ষমতার ভারসাম্য। অতীতে শক্তিশালী জাতীয় সরকার ‘ক্ষমতার মোকাবেলায় ক্ষমতা’ প্রদর্শন করতে পেরেছে বলেই জাতীয় স্বার্থে চুক্তি সম্পাদনে সক্ষম হয়েছে এবং সম্মানজনক সম্পর্ক অব্যাহত ছিল।
বৃহত্ প্রতিবেশী থেকে বাংলাদেশের মানুষ সত্ প্রতিবেশীমূলক সত্ভাব আশা করে। বাংলাদেশের মানুষ শান্তি স্থিতি ও সৌহার্দ্য চায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়- সাম্প্রতিক সময়ে এবং বিগত চার দশকে ভারত বন্ধুত্বের প্রমাণ না দিয়ে সম্প্রসারণবাদীর প্রমাণ দিয়েছে। বন্ধুপ্রতীম কংগ্রেস সরকার যে বেহাল দশা দেখিয়েছে তাতে বিরূপ প্রতীম বিজেপি সরকার সম্পর্কে শংকিত হতে হয় বৈকি! মোদি ক্ষমতায় এ ভাবনা আমাদের শংকিত করে। ভারতের প্রগতিশীল রাজনীতিবিদরা বলছেন বিজেপি জিতলে ঘরে ঘরে আগুন লাগবে। খোদ ভারতের জনগণ ভারতে গণতন্ত্র, বহুগোষ্ঠির সহাবস্থান ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভারতের দেশ ও বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ বুদ্ধিজীবীরা বলছেন এখন সময়ের দাবি হচ্ছে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিকে রক্ষা করা। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কোন আপোস হতে পারে না। সালমান রুশদীর মত লোকও বলছে: গুজরাট দাঙ্গা মোদির নৈতিক চরিত্র ও রাজনৈতিক নীতি আদর্শেও ব্যর্থতা ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণে সবসময়ই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতার বাইরে থাকলে এবং ক্ষমতাসীন হয়ে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি কি কুশলতা প্রদর্শন করে তা দেখবার বিষয়। বাংলাদেশের একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা বলেছেন: ‘বাংলাদেশ ভারতের রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে বন্ধুত্ব চায়। আস্ফাালন নয়।’
লেখক:প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,সাভার, ঢাকা।
email: [email protected]
