সমপ্রতি ইন্সটিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) ২০তম জাতীয় সম্মেলন ও ৩৮তম কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ষ্ঠ শ্রেণী হইতে ছেলেমেয়েদের অন্তত একটি বিষয়ে ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রদানের ঘোষণা দিয়াছেন। এই ঘোষণাকে আমরা স্বাগত জানাই। ইহাতে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের আত্মকর্মসংস্থানের পথ আরও খুলিয়া যাইবে বলিয়া আশা করা যায়। কিছুদিন আগে ইত্তেফাকের এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে যে, কানাডা সরকার পঞ্চাশটি ক্যাটাগরিতে দক্ষ অভিবাসী নিবে। কিন্তু ষোল কোটি মানুষের এই দেশে সবচেয়ে বড় অভাব দক্ষ জনশক্তির। বর্তমানে রেমিট্যান্স আমাদের দ্বিতীয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। যাহারা বিদেশে কাজ করিতেছেন তাহাদের বেশিরভাগই অদক্ষ এবং ভারত-পাকিস্তানের শ্রমিকদের তুলনায়ও কম মজুরি পান। বিশেষত যাহারা মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করিতেছেন তাহাদের ক্ষেত্রে এইকথা অধিক প্রযোজ্য। যদি আমরা দক্ষ মানব সম্পদ রফতানি করিতে পারি, তাহা হইলে আমাদের আয় আরও বহুগুণ বাড়িয়া যাইবে। পৃথিবীতে দক্ষ মানব সম্পদের প্রয়োজনীয়তা কী হারে বাড়িতেছে, তাহা কানাডা সরকারের চাহিদা দেখিয়া সম্যক উপলব্ধি করা যায়। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার ও একুশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা করিতে হইবে।
বলাবাহুল্য, স্কুল পর্যায়ে ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা সেই সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনারই ফসল বলিয়া আমরা মনে করি। ইতোমধ্যে এই সরকারের আমলে সর্বপ্রথম দেশে প্রায় ১৮০০টি বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে এসএসসি ভোকেশনাল কোর্স প্রবর্তন করা হইয়াছে। দেশে ভোকেশনাল বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রসারিত করিতে প্রতিটি উপজেলায় একটি করিয়া কারিগরি স্কুল স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছে। আমরা আশা করি, এই সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়িত হইবে। এইসব কর্মসূচির সহিত এইবার যোগ হইবে ৬ষ্ঠ শ্রেণী হইতে ছাত্র-ছাত্রীদের ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রদানের বিষয়টি। যেহেতু আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাইতে মাধ্যমিক পর্যায়ে ড্রপ আউটের সংখ্যা বেশি, সেহেতু এই সিদ্ধান্ত হইতে অনেক উপকার পাওয়া যাইবে। এই পর্যায়ে যাহারা স্কুল ছাড়িয়া চলিয়া যায়, তাহাদের অধিকাংশই কোন না কোন কাজে নিযুক্ত হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে তাহারা বলিতে গেলে অদক্ষ থাকিয়া যায়। যেমন এক রিপোর্টে জানা যায়, আমাদের দেশে যাহারা টেকনিক্যাল পর্যায়ের কাজ করে, তাহাদের ৬৪ শতাংশ কখনও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ লাভ করে নাই। তাই স্কুল পর্যায়ে ভোকেশনাল ট্রেনিং এই পরিস্থিতির উন্নতি বিধানে সহায়ক হইবে।
বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হইবে, অর্থনৈতিক বিবেচনায় আবির্ভূত হইবে ‘এশিয়ার টাইগার’ হিসাবে-এমন ভবিষ্যদ্বাণী আজ অহরহই উচ্চারিত হইতেছে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে। এই লক্ষ্যে পৌঁছাইতে হইলে আমাদের কারিগরি শিক্ষার উপর অধিক জোর দিতে হইবে। ছাত্র-ছাত্রীদের যথাসম্ভব উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত এই শিক্ষায় আগ্রহী করিয়া তুলিতে হইবে। আমাদের ধারণা হইল, এই শিক্ষা কেবল সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য। ইহাতে সন্তানরা লেবারার বা শ্রমিক হইবে। কিন্তু ইহা সত্য নহে। এক গবেষণায় দেখা যায়, যাহারা টেকনিক্যাল গ্রাজুয়েট তাহারা অধিকাংশ সময় যে কোন দেশের জিডিপিতে সাধারণ গ্রাজুয়েটদের তুলনায় বেশি অবদান রাখেন। তাহাছাড়া আমরা লক্ষ্য করিতেছি যে, আমাদের দেশে সাধারণ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার ক্রমবর্ধমান। এই চাপ সামলাইতে হইলে বিদেশ গমন ও আত্মকর্মসংস্থান উপযোগী ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নাই। আমাদের দেশে এই সংক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান ত্রুটি হইল এখানকার কারিকুলাম যুগোপযোগী নহে। বিশ্বে এই ধরনের শিক্ষার পঠন-পাঠন দ্রুত পরিবর্তনশীল। কিন্তু আমরা তাহার সহিত তাল মিলাইতে পারিতেছি না। এই শিক্ষা অধিকতর জীবন ও বাস্তবমুখী না হইলে তাহা হইতে কাঙ্ক্ষিত উপকার পাওয়া যায় না। এইজন্য একটা পর্যায়ে এইরূপ শিক্ষার্থীদের ইন্ডাসট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টও জরুরি।
যাহা হউক, স্কুলে ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের কার্যক্রম সফল করিয়া তুলিতে হইলে উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করিতে হইবে অবশ্যই। ইহার পাশাপাশি ইংরেজি, আরবি, জাপানি, চীনা, কোরিয়ান ইত্যাদি অত্যাবশ্যক বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও তাহার কমিউনিকেটিভ স্কিলের উপর জোর দিতে হইবে।
