আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার পালিত হবে মহান মে দিবস। প্রতি বছর মে মাসের পয়লা দিনটি পালিত হয়ে থাকে মে দিবস হিসেবে। এই দিবসটি হলো শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতির দিন। বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের বিজয়ের দিন, আনন্দ ও উত্সবের দিন। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান তুলে নতুন সংগ্রামের শপথ নেয়ার দিন।
মে দিবস হলো একটি সংগ্রামের নাম। তা প্রথমত এ কারণে যে, সংগ্রামের মধ্যদিয়েই এই দিবসটির উদ্ভব ঘটেছে। দ্বিতীয় আরেকটি কারণ হলো মে দিবস আয়োজনের ব্যাপারটাও শুরু থেকে আজ অবধি একটি সংগ্রামের বিষয় হয়ে রয়েছে। গত সোয়াশ’ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসে মে দিবস উদযাপনের জন্য দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণিকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সইতে হয়েছে নানা মাত্রার পুলিশী নির্যাতন, জেল-জুলুম, হুলিয়াসহ দমন-পীড়ন। সাথে সাথে মোকাবেলা করতে হয়েছে, মে দিবসের মর্মবাণীকে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমে বিভ্রান্ত, দিক নির্দেশাহীন ম্লান ও পানসে করে তোলার নানা অপপ্রয়াস। এখনো মে দিবস পালন করাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী কমবেশি একই পরিস্থিতি বিদ্যমান। আমাদের দেশেও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে মে দিবস উদযাপনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে।
মে দিবসের ইতিহাসের দিকে নজর দিলেই এর মৌলিক সংগ্রামী চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটের মূল দাবি ছিল আট ঘণ্টা কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ওই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারের বিশাল সমাবেশে মালিক ও সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর নির্বিচার লাঠিচার্জ ও গুলিতে শ্রমিকের রক্তে লাল হয়ে ওঠে হে মার্কেট চত্বর। আমেরিকার শ্রমিকদের এই আন্দোলনের ফলে বিভিন্ন স্থানে মালিকরা আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকী উপলক্ষে ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলসের নেতৃত্বে প্যারিসে দ্বিতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছরই সোশ্যালিস্ট লেবার ইন্টারন্যাশনালের সম্মেলনে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিনের ঘোষণা অনুযায়ী ১৮৯০ সাল থেকে প্রতিবছর ১ মে ‘মে দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এভাবেই আন্তর্জাতিকভাবে মে দিবস পালনের সূচনা হয়। অর্থাত্ মে দিবসের সামগ্রিক ইতিহাসই শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠা, মুক্তি অর্জন ও আন্তর্জাতিক সংহতির লক্ষ্যে ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাস। ফলে মে দিবসকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে বন্দী করার অর্থই হলো শ্রমিক শ্রেণিকে তার মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রাম থেকে বিচ্যুত করার প্রচেষ্টা। শ্রমিক শ্রেণির কাছে মে দিবস হলো নতুন সংগ্রামে উজ্জীবিত হওয়ার শপথের দিন। কারণ সংগ্রাম ছাড়া আর কোনো পথে শ্রমিকের পক্ষে তার ন্যায্য দাবি আদায় করা সম্ভব নয়।
মে দিবস উদযাপনকে কেন্দ্র করে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই আগে বলি। বেশ মনে আছে, ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম আমি মে দিবসের আনুষ্ঠানিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হই। সেবার তত্কালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত কল্যাণপুরে (সে সময় কল্যাণপুর এলাকাটি ছিল একটি গ্রাম। সেখানকার বাসা-বাড়িতে যেতে হলে ঢাকা থেকে পাকা রাস্তায় বাসে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে হেঁটে যেতে হতো ধানক্ষেত পার হয়ে) মে দিবস উপলক্ষে গোপন সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আমরা অর্ধশতাধিক তরুণ কমিউনিস্ট উপস্থিত ছিলাম। আত্মগোপনে থাকা পার্টি নেতাদের মধ্যে কমরেড আজাদ (মণি সিংহ), কমরেড আমিন (অনিল মুখার্জী), কমরেড করিম (জ্ঞান চক্রবর্তী), কমরেড কবির (মোহাম্মদ ফরহাদ) প্রমুখ সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। কিংবদন্তী এসব নেতাদের স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে আমরা অভিভূত হয়েছিলাম। তারচেয়ে বেশি অভিভূত হয়েছিলাম তাদের বক্তৃতা শুনে।
পাকিস্তান আমলে এভাবেই আমাদেরকে গোপনে মে দিবস উদযাপন করতে হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে সীমিত পরিসরে গোপনে আলোচনা সভার আয়োজন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূলের কোনো পার্টি শাখার উদ্যোগে ঘরের ভেতর দরজা-জানালা বন্ধ করে হারিকেন জ্বালিয়ে, পেছনে লাল পতাকা টানিয়ে মে দিবসের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়েছে। পার্টি শাখার এ ধরনের অনুষ্ঠানে হয়তো উপস্থিতির সংখ্যা থাকতো হাতেগোনা ১০-১২ জন। সে সময় এরূপ প্রবল প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও এভাবেই মে দিবস পালনের মধ্যদিয়ে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির সংগ্রাম অব্যাহত রাখার শপথ নিতো কমিউনিস্ট কর্মীরা।
অবশ্য সে সময় আইনসিদ্ধভাবে কর্মরত ট্রেড ইউনিয়নগুলোর উদ্যোগে মে দিবসের প্রকাশ্য অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হতো। এসব ট্রেড ইউনিয়নের অনেকগুলোই ছিল সরকারের দালাল বা সংস্কারবাদী ধারার। এসব অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক উপস্থিত হতেন। সে সময় অবশ্য এখনকার মতো ঢাকা শহরে মে দিবসের বড় কোনো সংগঠিত কেন্দ্রীয় মিছিল, র্যালি ইত্যাদির আয়োজন থাকতো না। ট্রেড ইউনিয়নগুলো মূলত শিল্পাঞ্চলেই স্থানীয়ভাবে তাদের অনুষ্ঠান আয়োজন করতো। আদমজীর বালুর মাঠ, ডেমরার পুকুরপাড়ের খেলার মাঠ, পোস্তগোলা, ঢাকেশ্বরী কটন মিল-লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিল সংলগ্ন গোদনাইল এলাকা প্রভৃতি স্থানে বড় শ্রমিক সমাবেশ হতো। সেসব অনুষ্ঠানে আমরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা দল বেঁধে শ্রমিক নেতাদের বক্তৃতা শুনতে এবং শ্রমিকদের সঙ্গে গল্প করতে যেতাম।
১৯৬৯-৭০ সালের দিকে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়। মে দিবসের অনুষ্ঠান গোপন অবস্থা থেকে প্রকাশ্যে আয়োজন হতে থাকে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রণাঙ্গনেই আমরা মে দিবসের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম।
স্বাধীনতার পর মে দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ অবারিত হয়েছিল। এটি ছিল অবধারিত। কারখানার শ্রমিকরা বিপুল সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিল। বিজয়ীর বেশে ফিরে এসে তারা আবার কাজে যোগ দিয়েছিল। তাদের উত্সবের দিন মে দিবস পালন ঠেকানোর সাধ্য কারো তখন ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে মে দিবস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেছিল। এ দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এতে মে দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে অনেকটাই মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সুতরাং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ মে দিবসেরও মুক্তির পথ উন্মোচিত করে দিয়েছিল। এসব বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার অর্জন আজও অব্যাহত আছে।
মে দিবস এখন শ্রমিকদের উত্সবের দিনে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর এই দিনে গার্মেন্টস, পরিবহন, ট্যানারিসহ সকল ক্ষেত্রের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন জাঁকজমকপূর্ণভাবে মে দিবসের কর্মসূচি পালন করে। শ্রমিকরা দলে দলে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, রঙ ছিটিয়ে এসব অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। পুরুষের পাশাপাশি এখন নারী শ্রমিকরাও মে দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সব মিলিয়ে মে দিবসে ঢাকা শহর আজকাল শ্রমিকের উত্সবের নগরীতে পরিণত হয়।
মে দিবস পালনের ক্ষেত্রে বাধা দূর হয়ে এ দিনটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছে ঠিকই। মে দিবস খুব জাঁকজমকের সাথে উদযাপন হয় ঠিকই। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণি যে বিষয়গুলো মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছিল তার অবস্থা এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? বাস্তব সত্য হলো— মে দিবসে আজকাল হৈ-চৈ ও আড়ম্বর এবং ঢাক-ঢোল ও প্রদর্শনবাদী নানা আয়োজন থাকলেও ম্লান হয়ে গেছে মে দিবসের সংগ্রামী মেজাজ ও আন্তর্জাতিক সংহতিবোধ। মে দিবস পালনে এই আপেক্ষিক মুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেও লাখো শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার মতোই এদেশে ‘মে দিবসের মুক্তি’ও হোঁচট খেয়েছে। পেছনে পড়ে গেছে মেহনতি মানুষের মুক্তির প্রশ্নটি। শোষণ-বঞ্চনা ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে প্রতিটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও আজ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বরঞ্চ দেশ এখন চলছে একেবারে উল্টো পথে। অবাধ লুটপাট ও শোষণ-বৈষম্যের পথে। ‘বাজার অর্থনীতি’ দখল করে নিয়েছে সমাজতন্ত্র লক্ষ্যাভিমুখী যাত্রাপথ।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার পথে অগ্রসর হওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭২-এর সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’কে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশকে সে ধারা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে শ্রমিক শ্রেণি এবং জনগণের অধিকার ও কর্তৃত্ব স্বীকার করা হলেও আজ পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং জনগণের সম্পদ ও উত্পাদন ব্যবস্থার সমুদয় কর্তৃত্ব প্রায় একচেটিয়াভাবে চলে গেছে মুষ্টিমেয় লুটেরা ধনিক শ্রেণির হাতে।
সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— ‘উত্পাদন যন্ত্র, উত্পাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন দেশের জনগণ।’ ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকে— কৃষক ও শ্রমিকের এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্ত করা।’ ২০(১) অনুচ্ছেদে কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস রচিত কমিউনিস্ট ইশতেহার বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে— ‘কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতা অনুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী’— এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।’
সংবিধানে এখনো এসব অনুচ্ছেদ বহাল থাকলেও তথাকথিত মুক্তবাজার নীতির নামে ‘উত্পাদন যন্ত্র, উত্পাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালী’র মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ জনগণের হাত থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। অসংখ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে তা তুলে দেয়া হয়েছে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হাতে। ‘কৃষক ও শ্রমিকের এবং জনগণের অনগ্রসর অংশের’ ওপর এখনো চলছে নানামাত্রিক শোষণ-নিপীড়ন। ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে শ্রমিকদের। নারী শ্রমিকদের ওপর চলছে অধিকতর বঞ্চনা ও বৈষম্য।
ফলে শ্রমিক স্বার্থের অনুকূল প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও গত ৪৩ বছরে বাংলাদেশ সেখান থেকে পিছিয়ে এসেছে। মে দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রেও এই পশ্চাত্পদতার প্রভাব পড়েছে। মে দিবসের আনুষ্ঠানিকতা এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রদর্শনবাদ, রাজনৈতিক শো-ডাউন, চাটুকারিতা, নেতা-নেত্রীভজন ইত্যাদির মধ্যে বন্দী হয়ে গেছে। এক কথায়, মে দিবস পরিণত হয়েছে অনেকটাই স্থূল আনুষ্ঠানিকতায়। এই দিনটি যে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ধারাবাহিকতার অংশ— সে বিষয়টি ক্রমশ ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মে দিবসের মর্মবাণীকে ভুলিয়ে দিয়ে তাকে বিকৃত করার পরিকল্পিত প্রয়াসকে রুখতে হবে। বুলন্দ আওয়াজ তুলতে হবে— ‘দুনিয়ার মজদুর-এক হও’ এবং ‘শ্রমিক রাজ, কৃষক রাজ-কায়েম কর’।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : [email protected]
