সরকারি আইনি সহায়তা বদান্যতা নয়

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২২:১৭
দেশের জনসাধারণকে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ কার্যকরের তারিখ অর্থাত্ ২৮ এপ্রিলকে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ঘোষণা করার পর থেকে সারাদেশে সরকারিভাবে দিবসটি উদযাপন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ২৮ এপ্রিল ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ উদযাপন করা হচ্ছে। জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ২০১৪-এর প্রতিপ্রাদ্য হচ্ছে ‘গরিবের মামলার ভার, বহন করে সরকার।’ বাংলাদেশের লিগ্যাল এইড ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক তথা পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দেয়ার জন্য একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার বিগত মেয়াদে ক্ষমতা থাকাকালে ২০০০ সালের ২৬ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ পাস করে। পরবর্তীতে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর ৭ (ক) ধারা অনুসারে আইনগত সহায়তা প্রদান নীতিমালা, ২০০১-এর ২৪ ধারা অনুসারে আইনগত সহায়তা প্রদান প্রবিধানমালা, ২০০১ প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন, দায়িত্ব, কার্যাবলী ইত্যাদি প্রবিধানমালা, ২০১১ প্রণয়ন করা হয়। ২০০৯ সালের পর থেকে নানামুখী প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সরকার দুস্থ ও অসহায় মানুষের কল্যাণে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে একটি কার্যকর সংস্থায় পরিণত করেছে। নিয়োগপ্রাপ্ত জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তারা গরিব ও অসহায় মানুষকে আইনগত সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি আইনগত পরামর্শও প্রদান করছেন। আইনি সহায়তা পেতে ইচ্ছুক ব্যক্তি নির্ধারিত ফরমে সরাসরি লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদনের মাধ্যমে, উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বারের মাধ্যমে, সমাজ সেবা ও জাতীয় মহিলা সংস্থার কর্মকর্তার মাধ্যমে, কারাগারে আটক ব্যক্তি জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা লাভ করতে পারেন। এছাড়া বিচারাধীন মামলায় আইনগত সহায়তার জন্য প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আদালতকেও অবগত করাতে পারেন। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা কর্তৃক প্রদেয় সেবাসমূহ হল— আইনগত পরামর্শ প্রদান, বিনামূল্যে ওকালতনামা সরবরাহ, মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ, আইনজীবী ফি পরিশোধ, মধ্যস্থতাকারী বা সালিশকারীর সম্মানী পরিশোধ, বিনামূল্যে রায় কিংবা আদেশের অনুলিপি সরবরাহ, ডিএনএ টেস্টের যাবতীয় ব্যয় পরিশোধ, ফৌজদারি মামলায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ব্যয় পরিশোধ এবং মামলা সংশ্লিষ্ট প্রাসঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় পরিশোধ। সংস্থা থেকে যেসব ফৌজদারি মামলায় সরকারি আইনি সহায়তা প্রদান করা হয় তা হল—স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে স্বামীর বিয়ে, শারীরিক নির্যাতন, যৌতুক দাবি বা যৌতুকের জন্য নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, পাচার, অপহরণ, ধর্ষণ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আটক বা গ্রেফতার। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে সন্তানের অভিভাবকত্ব, ভরণ-পোষণ ও দেনমোহর আদায়, বিবাহ বিচ্ছেদ, সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধার, দলিল বাতিল, স্থানী নিষেধাজ্ঞা, সম্পত্তি বণ্টন বা বাটোয়ারা, ঘোষণামূলক মামলা ও চুক্তি সংক্রান্ত মামলা। দেওয়ানি ও ফৌজদারি ছাড়াও পারিবারিক, জেল আপিলসহ যে কোনো মামলায় মামলা দায়েরের পূর্বে কিংবা চলমান অবস্থায় মামলার বাদী, বিবাদী, ফরিয়াদী বা আসামি আইনগত সহায়তা নিতে পারেন। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমের সাফল্য নির্ভর করছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও জনমত সৃষ্টির ওপর। দেশের জনগণের বিরাট একটি অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক মানুষ নিরক্ষর। দরিদ্র ও নিরক্ষর জনগণ তাদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে মোটেও সচেতন নয়। এসব মানুষের অধিকার লংঘিত হলে অথবা কোনো আইনি জটিলতায় পতিত হলে আর্থিক দৈন্যতা কিংবা দারিদ্র্যতার কারণে তারা আদালতের আশ্রয় নিতে পারে না। আর এভাবেই দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য দূর হয়, অন্যায়-অবিচার থেকে দুর্বলরা নিষ্কৃতি পায় এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে তাই লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। আইনগত সহায়তাকে এতদিন রাষ্ট্রের দান বা বদান্যতা মনে করা হলেও আধুনিককালে এ ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। গরিব-দুঃখী মানুষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি সহায়তা প্রদান করা এখন আর করুণা বা বদান্যতা নয়, বরং এটি নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের এক অপরিহার্য দায়িত্ব। লেখক : সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন