ঢাকার চালচিত্র

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২৩
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। শিক্ষা বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু, স্বাস্থ্য সেবা, সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ এবং মানুষের বসবাস ও জীবনধারণের চাহিদা মেটানো যার এখতিয়ারভুক্ত সে ঢাকা হতচরিত্রের অধিকারী। যানজট, গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকট, পানির হাহাকার, ঢাকাবাসীর নিত্যসহচর। প্রচণ্ড তাপদাহে ঢাকাবাসী পুড়ছে। পার্ক নেই। সবুজ অরণ্যানী কেটে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। নদ-নদী, সবুজ বৃক্ষ ছিল ঢাকার অলংকার। বুড়িগঙ্গা সরু হয়ে ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। নদ-নদীর পানিতে রাসায়নিক বর্জ্য, মানুষের ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, খুন, অপহরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা তীব্রতর। ঢাকা এক অনিরাপদ জনপদে পরিণত হয়েছে। ঢাকা ঢেলে সাজানো, পরিবেশ উন্নত রাখার জন্যে সচেতন জনগোষ্ঠীর দাবি দীর্ঘদিনের। সরকারি বেসরকারি সাহায্য সংস্থার কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তবু ঢাকার জীর্ণ চেহারার পরিবর্তন হয়নি। ঢাকা এখন বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেনের শহর। এসএসসি, এইচএসসি পাসের হার বেড়েছে ঢাকায়। কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশন কেন্দ্র অলিতে-গলিতে। বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে গেছে ঢাকার। ভাঙ্গা-গড়ায় অদক্ষ, অশিক্ষিত, হাতুড়ে মিস্ত্রীদের হাত পড়েছে। আবাসিক এলাকা, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থান এখন আর আলাদা করা যায় না। প্যাথলজি সেন্টার, রোগ নিরাময় কেন্দ্র, ট্যানারি, কল-কারখানায় ঢাকা সয়লাব। বাতাসে শিশা, ধোঁয়া, রোগ বিস্তারি জীবাণুর দাপাদাপি। ফুল, পাখি, শিশুর কলতান উধাও হয়ে গেছে। শিশু-কিশোরদের কাঁধে ভারী ব্যাগ তারা সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত্রি দৌড়োচ্ছে। সঙ্গে তাদের বাবা-মাও। খেলার মাঠ নেই। বন্ধু নেই। নিরিবিলি নিভৃতে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ভাগ করে নেয়ার জায়গা নেই। ফাস্টফুড রেস্তোরাঁ, ক্লিনিকের ব্যবসা রমরমা। মতলব মানুষের দিন-রাত্রি ছুটোছুটি। আদালতপাড়া, থানায় জটলা। যে কোন মামলায় ফেলে দেয়ার চক্রান্ত চলছে। বুড়িগঙ্গা নদী ঢাকার প্রাণশক্তিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বুড়িগঙ্গা নদী এখন মৃত প্রায়। নদীকে হত্যা করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধারণ করা সম্ভব নয়। সুস্থ মানুষ গড়ে তুলতে নদ-নদী ও প্রকৃতির ভারসাম্যতা রক্ষা করার বিকল্প কোন ভাবনা নেই। তবু ঢাকাবাসী বুড়িগঙ্গার সুস্থ ধারা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হয়েছিল সপ্তদশ শতাব্দীতে। বুড়িগঙ্গা নদী তীর সংলগ্ন এলাকায় ঐতিহাসিক স্থাপনা লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল গড়ে ওঠে। সোয়ারি ঘাটের নৌকা ভ্রমণ জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের স্মৃতিতে এখন জ্বল জ্বল। বাঁকল্যান্ড বাঁধে ভ্রমণ নির্মল বায়ু সেবনের সেই আয়োজনটির অনুপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শোধনাগার নির্মিত হয় চাঁদনি ঘাট এলাকায়। বুড়িগঙ্গা নদী থেকে উত্সারিত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। তুরাগ ও বালু নদীতে বিপর্যয় ঘটেছে। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি একদল সুবিধাবাদীর নদী ভরাট বালু ব্যবসাসহ অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলায় ঢাকার নদী হারিয়ে গেছে। ৩৬০ কিলোমিটারের ঢাকার লোকসংখ্যা এক কোটি অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি বছর চার থেকে পাঁচ শতাংশ মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করায় ঢাকার সমস্যা আরো ঘনীভূত করেছে। ট্যানারি থেকে প্রায় ১৬,০০০ ঘনমিটার রাসায়নিক তরল ও অদ্রবীভূতে বর্জ্য নিষ্কাশিত হয়ে পানিকে দূষিত করে তুলছে। গার্মেন্টস শিল্প থেকে আসছে কাপড়ের বর্জ্য ও বিবিধ উপাদান। এসব বর্জ্য ঘুরে-ফিরে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিশছে। ঢাকাবাসীর ত্যাগ করা বর্জ্যের মধ্যে মাত্র শতকরা ২০ ভাগ পরিশোধন করা সম্ভব হয় মাত্র। শতকরা ৪০ ভাগ অপরিশোধিত হয়ে নদীতে চলে যাচ্ছে। নারকেলের খোসা, পলিথিন, ছেঁড়া কাপড় নদীতে জমে নদীর পানি দূষিত করছে। কালো পানি, বিষাক্ত মলমূত্র, রাসায়নিক উপাদানে মিলে-মিশে নদীর নাব্যতা ও প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। জলযান টারমিনালে আসা-যাওয়া করে। এসব জলযান থেকে বর্জ্য, নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী নদীতে ফেলে দেয়া হয়। নদী ভরাট হয়ে গেছে। ড্রেজিং করে নদীর স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার পরিকল্পতা চোখে পড়ছে না। নদীর পানি অস্বাভাবিক দূষণ হওয়ায় শোধনের জন্যে শক্তিশালী ক্যামিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে যা ব্যয়বহুল। বুড়িগঙ্গা নদীর পাশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রভাবশালী মহলের দখল প্রতিযোগিতার দৃশ্য ভয়াবহভাবে পরিবেশ বিপর্যয় ও নদীর নাব্যতা পূরণসহ পানিকে প্রতিনিয়ত দূষিত করছে। বুড়িগঙ্গার প্রাণ স্পন্দন স্তব্ধ করে ঢাকার সৌন্দর্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পয়ঃনিষ্কাশন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি পানি-বিদ্যুত্ বিতরণে ও উত্পাদনে নজর দিতে হবে। সরকারি বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ঢাকার সংকট নিরসনে সহায়ক হতে পারে। পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। শহর জুড়ে চলছে পানি না পাওয়ার হাহাকার। বিদ্যুত্ সরবরাহ বাড়লেও ঢাকায় বিদ্যুত্ সমস্যা প্রকট। গ্যাস ও পানির অভাব ঢাকাবাসীকে ভোগাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ঢাকা শহরে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ চোখে পড়ে। সিটি করপোরেশনের গাড়ি প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে নেয়। নগরবাসীর সচেতনতার অভাব, ময়লা ফেলার পাত্র না থাকা, নগরের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকায় ঢাকা নোংরা বর্জ্যের পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। হর-হামেশা ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হচ্ছে। নগরের সেবাদানকারী সংস্থার প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি না থাকায় ঢাকাবাসী অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। বর্জ্য অপসারণ ও নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে না পারলে ঢাকাবাসী যে তিমিরে আছে সেই তিমিরেই থেকে যাবে। ঢাকায় বৃষ্টির পানিতে রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যায়। পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বর্জ্যে ভরা। ঢাকাকে দৃষ্টিনন্দন করতে পর্যটন কেন্দ্রসমূহের বিস্তার ঘটাতে হবে। লালবাগ কেল্লায় লাইট এন্ড সাউন্ড সিস্টেম তৈরি করে নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। ঢাকার অন্যান্য আকর্ষণীয় স্থান ও প্রতিষ্ঠান বিবিধ কর্মসূচির মাধ্যমে দর্শকদের কাছে গ্রহণীয় করে উপস্থাপন করা জরুরি। প্রচার-প্রচারণায়ও ব্যাপ্তি ঘটাতে হবে। বাংলাদেশে মৌসুমী বায়ু প্রবাহের কারণে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বায়ু দূষণ ও প্রকৃতির পালাবদলে ঋতুবৈচিত্র্যে এখন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বৃষ্টি নেই। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, বসন্ত ঋতু আসে ধীরে ধীরে। প্রকৃতির মতো মানুষও রুদ্র। পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অস্থির আমরা। বৃক্ষ শোভিত ঢাকা এখন ইট-কাঠ আর হূদয়হীনের নানা ঘটনার সাক্ষী। ঢাকার পরিবেশ উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ যানজট অতিক্রম হয়নি। ফ্লাইওভার, ব্রিজ তৈরি হয়েছে বটে। ঢাকায় সহজ যাতায়াত, মানুষের চাহিদা অনুযায়ী উপকরণ সরবরাহ ও জীবনযাত্রার মান উন্নীত করা জরুরি। নিরাপত্তাহীনতায়ও আমরা ভুগছি। সড়ক দুর্ঘটনা ও আততায়ীর হাতে অনেককে মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে। আমাদের সন্তানেরা খাচায় বন্দী, পাঠ্য পুস্তকের সিলেবাসে শৃঙ্খলিত। মানুষে মানুষের সমপ্রীতি আর বাসযোগ্য ঢাকা নির্মাণে আজ প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারি বেসরকারি সংস্থার যৌথ কর্মপ্রয়াস ঢাকার দীনতা ঘোচাতে পারে- সেদিকে লক্ষ্য করতে হবে। লেখক:প্রাবন্ধিক, গবেষক। [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন