দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২৯
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী চাং হং উন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া সকলের দৃষ্টি কাড়িয়াছেন। অবশ্য, পশ্চিমা বিশ্বেতো বটেই, এমনকি ভারত ও জাপানসহ এশিয়ারও বিভিন্ন সভ্য এবং গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা মাঝে-মধ্যেই এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া থাকেন। তবে তৃতীয় বিশ্বের অপরাপর দরিদ্র এবং শাসন ব্যবস্থার বিশৃংখলাপূর্ণ দেশগুলিতে বলিতে গেলে এমন নজির স্থাপনের তেমন কোন ঘটনাই চোখে পড়ে না। দক্ষিণ কোরিয়ার সাগর উপকূলে একটি ফেরি ডুবির ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ সমস্ত বিচারেই এক মহত্ এবং বিরল ঘটনাই বটে। ফেরি ডুবির দশ দিন পর তিনি ডুবন্ত ফেরি উদ্ধারে উহার কর্মীদের কাজে ধীরগতি, ব্যর্থতা এবং যাত্রী মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধিতে এমনই ব্যথিত ও মর্মাহত হইয়াছেন যে, ইহার দায় তিনি নিজে স্কন্ধে গ্রহণ করিয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হইতে পদত্যাগ করিয়াছেন। এই ধরনের একটি দুর্ঘটনার দারিদ্র্য লাঞ্ছিত কোনো দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী দূরে থাক সচিব বা ব্যবস্থাপক কোন পর্যায়েরই কেহ দায় নিতে রাজি নহে। তাহাদের সাফ কথাটি যেন এই রকম যে, আমিতো ফেরি বা সংশ্লিষ্ট যানটির চালক নহি যে, উহার দুর্ঘটনার দায় আমাকে লইতে হইবে। এইসব দেশে এমন ক্ষেত্রে বড় জোর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করিয়াই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাহাদের দায়-দায়িত্ব শেষ করিয়া থাকেন। আর এইখানেই গণতন্ত্র চর্চা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতার অভাবটি প্রকট হইয়া ধরা দেয় বৈকি! দক্ষিণ কোরিয়ার ফেরিটি ডোবার ব্যাপারে উহা রোধে ব্যর্থতার দায় প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করিয়া এবং পদত্যাগের মাধ্যমে যে সত্যটি এবং যে গণতান্ত্রিক চেতনাটিকে মূর্ত করিয়া তুলিয়াছেন তাহা এই যে, রাষ্ট্র পরিচালকেরা জনগণের কল্যাণ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তার সহিত সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়েরই দায়িত্ব এড়াইতে পারেন না। কেননা, জনগণ তাহাদেরকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসায় জননিরাপত্তা ও জনগণের ভালাইয়ের দেখ-ভাল করিবার জন্য। সুতরাং জননিরাপত্তা বা জনস্বার্থে বিঘ্ন ঘটিলে সরকার বা রাষ্ট্রের প্রধান কর্ণধারকেই সেই দায় মাথা পাতিয়া লইতে হইবে। ইহাই সভ্যতা এবং জনকল্যাণাভিসারী শাসনের সৌন্দর্য। দক্ষিণ কোরীয় প্রধানমন্ত্রী তাহার দায়িত্ববোধের এবং জবাবদিহিতার যে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন তাহাতে একজন সভ্য-শোভন, মানবতাবাদী ও গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষেরই পরিচয় মেলে। ইউরোপ-আমেরিকায় নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্র চর্চা অব্যাহত থাকায় এবং সুশৃংখল সমাজ নির্মিত হওয়ায় সর্বস্তরেই দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার বিষয়টি অত্যন্ত যত্নের সহিত প্রতিপালিত হয়। ভারতে দারিদ্র্য, হতাশা, হানাহানি এবং সমাজে অনেক ধরনের হীনতা দেখিতে পাওয়া গেলেও সেইখানে গণতন্ত্রের ভিতটিও এমনই মজবুত যে, ইচ্ছা করিলেই সমাজপতিরা বা বলশালীরা সেইখানে যাহা মনে চাহে তাহাই করিতে পারেন না। কেননা, সেইখানেও সরকার পরিচালকদের মধ্যে ব্যর্থতার দায়ভার স্কন্ধে তুলিয়া লইবার নজিরও নেহায়েত কম নহে। ফলে অন্যরা ঐ দৃষ্টান্তের কথা মাথায় রাখিয়া চলিতে বাধ্য হয় আর তাহাতে যথেচ্ছারের সুযোগ এবং সম্ভাবনাও হ্রাস পায়। দক্ষিণ কোরীয় প্রধানমন্ত্রীর এই পদত্যাগ গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রয়াসে সচেষ্ট যে কোনো দেশের নেতাদের জন্য শিক্ষনীয় বটে। দক্ষিণ কোরীয় সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় সীমা-পরিসীমা কতটুকু উহা বিবেচনায় না লইয়াও বলা যায় যে, প্রধানমন্ত্রীর এই জবাবদিহিতার মানসিকতার মধ্যেই সেই দেশের নেতৃবৃন্দের গণতান্ত্রিক চেতনাটি সমুজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। যাহারা শাসন ক্ষমতা লাভ করেন তাহারা যে জনগণের সেবক, প্রভু নহেন এই চেতনা যতদিন পর্যন্ত না নেতা-নেত্রী ও আমলাদের মনে প্রোথিত হইবে ততদিন পর্যন্ত জনদুর্ভোগ হ্রাস পাইবার সম্ভাবনা যে অতীব ক্ষীণ হইয়া থাকিবে ইহাতে কোনই সন্দেহ নাই। গণতন্ত্রের কথা শুধু বুলি হিসাবে মুখে কপচাইলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়া যায় না। এইজন্য নেতৃবৃন্দের বা দেশ পরিচালকদেরকে নিজ স্বার্থত্যাগ আর তিতিক্ষা-সততা-মমত্ব প্রদর্শনের জন্য সদা তত্পর থাকিতে হয়। নিরবচ্ছিন্ন চর্চাই কেবল পারে চাং হং উনের মতো ত্যাগী ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন নেতার জন্ম দিতে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন