পলিথিন :আইন ও বাস্তবতা

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩০
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হইলেও বাস্তবে ইহার ব্যবহার কমিতেছে না, বরং বহুক্ষেত্রে বাড়িয়া চলিয়াছে। শুধু ব্যবহারই নহে, পলিথিন উত্পাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয়, মজুদ, বিতরণ, পরিবহন ইত্যাদি সবই নিষিদ্ধ। অর্থাত্ আইন প্রণয়নের সময় কোন প্রকার ফাঁক রাখা হয় নাই বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। তবু এই সংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়ন নিয়া পরিবেশবিদসহ অনেকের মধ্যে হতাশা কাজ করিতেছে। রাজধানীর বাজারগুলিতে বিশেষত কাঁচাবাজারে এবং গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে আজকাল অহরহ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করিতে দেখা যায়। বাংলাদেশে পলিথিনের ইতিহাস ঘাঁটিলে জানা যায়, আশির দশকে এই দেশে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। দামে কম ও ব্যবহারে সুবিধা বলিয়া ইহার ব্যবহারে মানুষ সহজেই অভ্যস্ত হইয়া পড়ে। কিন্তু তখন পলিথিনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বিবেচনা করা হয় নাই। পরে ইহা লইয়া পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হইলে ২০০২ সালের ১লা জানুয়ারি হইতে তাহা নিষিদ্ধ করা হয়। ইহা এখনও নিষিদ্ধই আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ সেইভাবে নাই বলিলেই চলে। বস্তুত যে আইন মানা হয় না বা মানিয়া চলা কঠিন, তাহার প্রয়োগেও শৈথিল্য প্রদর্শিত হইবে। ইহাই স্বাভাবিক। পলিথিন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নহে, এই কথা আমরা কস্মিনকালেও বলি না। আমরা জানি, যত্রতত্র পলিথিন ব্যবহার ও ইহা পড়িয়া থাকার কারণে খাবার পানি, মাটি ও বায়ুর দূষণ দেখা দেয়। শহরাঞ্চলের ড্রেনেজ সিস্টেম অকেজো করিয়া দেখা দেয় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা। কিন্তু ইহার বিকল্প ব্যবস্থা বা বিকল্পের কথা চিন্তা না করিয়া আইন প্রণয়নের কারণে ইহা কার্যকর করা যাইতেছে না। শপিংমলসমূহে একালে সুদৃশ্য কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই ব্যাগ দিয়া কাঁচাবাজার বহন করা সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায় পলিথিনের বিকল্প হিসাবে অনেকে কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহারের কথা বলেন। কিন্তু এইসব ব্যাগের দাম যেমন বেশি, তেমনি তাহা সুলভ নহে। কেহ কেহ পলিথিনের ব্যবহার কমাইতে সরকারের পক্ষ হইতে ভর্তুকি দিয়া পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়াইবার পরামর্শ দেন। ইহাতে পাট শিল্পের পুনর্জাগরণ হইবে এমন আশাবাদও ব্যক্ত করেন। কিন্তু ভর্তুকি কোন কাজের কথা নহে। কেননা ভর্তুকির বোঝা শেষপর্যন্ত জনগণের কাঁধেই চাপিয়া বসে বলিয়া আমরা বরাবরই ইহার বিপক্ষে। বলাবাহুল্য, এই সমস্যা আসলে বিশ্বব্যাপীই বাড়িতেছে। উন্নত দেশগুলিও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করিতে পারে নাই। এইজন্য তাহারা রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন করিয়া পলিথিন বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করিতেছে। বর্জ্য পলিব্যাগগুলি যথাযথভাবে সংগ্রহের ব্যাপারে সেইসব দেশের জনগণ সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করিয়া থাকেন। মালয়েশিয়া মেয়াদ নির্দিষ্ট করিয়া পলিথিন তৈরি করিতেছে বলিয়াও জানা যায়। ইহাতে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাহাতে পচন ধরিতেছে এবং পরিবেশের জন্য তাহা কোন হুমকি হইয়া দেখা দিতেছে না। বাংলদেশেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া যাইতে পারে। বিশেষত রিসাইক্লিংয়ের উপর অধিক জোর দিতে হইবে। প্লাস্টিক বোতল রিসাইক্লিংয়ের ব্যবস্থা থাকায় তাহা টোকাইদের কল্যাণে দ্রুত রাস্তা-ঘাট হইতে অপসারিত হইতেছে। পলিথিন এমনকি শিল্পজাত বিভিন্ন মোড়কের রিসাইক্লিংকে প্রাধান্য দিয়া প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও কর্মসূচি গ্রহণ করিতে হইবে। এইসব পণ্যের ব্যবহার ও যত্রতত্র ফেলিয়া রাখিবার ব্যাপারে সর্বসাধারণকে সতর্ক ও সচেতন করিয়া তুলিতে হইবে। এইজন্য দরকার ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণা। তবেই আমরা পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব হইতে আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করিতে পারি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন