গুম-অপহরণ থামিবার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। বরং তাহা যেন ক্রমে আরও ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করিতেছে। বহুল আলোচিত আবু বকর সিদ্দিক অপহরণকাণ্ডের অভিঘাত থামিবার আগেই আবারও অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে। এইবার অপহূত হইয়াছেন সর্বমোট ৭ জন। কাকতালীয়ভাবে ঘটনাস্থলও সেই নারায়ণগঞ্জই। অপহূতদের অন্যতম হইলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম। স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের প্রভাবশালী এই নেতা নারায়ণগঞ্জ আদালত হইতে ব্যক্তিগত গাড়িতে করিয়া ঢাকায় যাওয়ার পথে গত রবিবার দুপুরে চার সঙ্গীসহ অপহূত হন। একইভাবে প্রায় একই সময়ে একই স্থান হইতে চালকসহ অপহূত হইয়াছেন নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার। পরিত্যক্ত অবস্থায় তাহাদের গাড়ি পাওয়া গেলেও অপহূতদের সন্ধান মেলে নাই। শুধু তাহাই নহে, মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থান হইতে দুইজন শিক্ষকসহ আরও ৭ জন অপহূত হইবার খবর ছাপা হইয়াছে সংবাদপত্রে। আমাদের দেশে বিচ্ছিন্নভাবে গুম-অপহরণের ঘটনা আগেও ঘটিয়াছে। তবে এখনকার পরিস্থিতি যে স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করিয়া গিয়াছে ক্ষমতাসীন দলের প্রবীণ এক নেতাও অকপটে তাহা স্বীকার করিয়াছেন। তিনি বলিতে বাধ্য হইয়াছেন যে, অবস্থার ভয়াবহতা আইনের শাসনে বিশ্বাসী মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করিয়া তুলিয়াছে। তাঁহার এই মন্তব্যের জোরালো ভিত্তিও রহিয়াছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুয়ায়ী, ২০১০ হইতে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ২৬৮ জন অপহূত হইয়াছেন। তন্মধ্যে ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হইলেও ১৮৭ জন এখনও নিখোঁজ। সঙ্গত কারণেই জনমনে সৃষ্টি হইয়াছে গভীর উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ। তাহার বহিঃপ্রকাশও ঘটিতেছে নানাভাবে।
সব মিলাইয়া যেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে তাহাকে কোনোভাবেই স্বস্তিকর বলা যাইবে না। একের পর এক যেইভাবে গুম ও অপহরণের ঘটনা ঘটিতেছে এবং তাহা লইয়া যেই প্রকারে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা হইতেছে তাহাতে সকলের মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতার বোধ সঞ্চারিত হইতে বাধ্য। সেই সাথে একদিকে প্রতিকারহীনতা, অন্যদিকে রাজনীতির ক্ষেত্রে বিরাজমান পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করিয়া তুলিয়াছে। অপহূত ব্যক্তিবর্গের তালিকার দিকে তাকাইলে দেখা যায় যে, দলীয় পরিচয়ের বাহিরেও বিভিন্ন শ্রেণীপেশার বহু মানুষও ইহার শিকার হইয়াছেন। রক্ষা পাইতেছেন না ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাইতেছে যে, ইহার পিছনে রহিয়াছে জমিজমা-সংক্রান্ত, পারিবারিক বা ব্যবসায়িক বিরোধ, নেতৃত্বের কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি বা মুক্তিপণ আদায়ের মতো ঘটনা। কিন্তু গুম-অপহরণের সমুদয় দায় ঢালাওভাবে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর চাপাইয়া দেওয়ার একটি অসাধু চেষ্টা চলিয়া আসিতেছে প্রথমাবধি। সরকারের দায় অবশ্যই আছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা যে সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল, সমাজে গুম-অপহরণের প্রবণতা কেন চরমাকার ধারণ করিল—সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নটি সকলেই সযত্নে পাশ কাটাইয়া যাইতেছেন। আমরা মনে করি, এই দুঃসহ অবস্থা হইতে পরিত্রাণ পাইতে হইলে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেরই এইদিকে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। কারণ রোগ সারাইতে হইলে সর্বাগ্রে সঠিকভাবে রোগ শনাক্ত করিবার যে কোনো বিকল্প নাই তাহা কে না জানে!
ঐতিহ্যগতভাবে এই জনপদের মানুষ শান্তিপ্রিয়। ঝগড়া-বিবাদ কিংবা মতানৈক্য থাকিলেও যুগ যুগ ধরিয়া নানা মতাদর্শের মানুষ এই দেশে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করিয়া আসিতেছে। হঠাত্ করিয়া তাহারা কেন এতোটা অসহিষ্ণু হইয়া উঠিল, কেন গুম-খুন-অপহরণের মতো হিংস্রতা তাহাদের উপর আছর করিল—তাহা অবশ্যই গভীরভাবে বিচার-বিবেচনার দাবি রাখে। অভিজ্ঞতা বলে, আইন-কানুন, নিয়মনীতি ও প্রশাসনের উপর আস্থার অভাব ঘটিলেই কেবল এই ধরনের প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়া উঠে। আমাদের পারিপার্শ্বিক বাস্তবতাও যে খুব একটা ভিন্ন নহে—তাহা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন।
