পতঙ্গখেকো কিছু বৃক্ষ রহিয়াছে যাহারা দৃষ্টিনন্দন ফুল ফোটায় পতঙ্গকে আকৃষ্ট করিতে। কোনো কোনো মানুষ এখন যুগপত্ পতঙ্গ ও পতঙ্গখেকো বৃক্ষ। অতি মনোহর রঙের লিচু বা আম দেখিয়া আকৃষ্ট হইয়া তাহার স্বাদ লইতে ব্যাকুল হইলে বিপদাপন্ন হইতে পারে জীবন। বিষাক্ত রং বা ভেজাল কীটনাশক বা বিবিধ রাসায়নিকের দৌরাত্মে খাদ্যদ্রব্য দিন দিন বিষতুল্য হইয়া যাইতেছে, তাহা পুরানো খবর। কিন্তু কী পরিমাণে সেই বিষের পারদ চড়িতেছে, তাহার গ্রাফ আমাদের সম্মুখে তুলিয়া ধরা হইলে চমকাইয়া উঠিতে হয় বৈকি। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বাজারে প্রাপ্ত সব ধরনের খাদ্যের মধ্যে ন্যূনতম ৪০ শতাংশই বিষাক্ত। এবং ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির নমুনা পরীক্ষায় ধরা পড়িয়াছে সেই বিষের ভয়াবহতা। তাহা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ডের বিচারে তিন হইতে বিশ গুণ অধিক বিষাক্ত। আরও ভয়ের কথা হইল, ৮২টি নমুনা পরীক্ষায় কয়েক দশক পূর্বে নিষিদ্ধ হওয়া ডিডিটি, ক্লোরডেন, হেপ্টাক্লোর জাতীয় ভয়াবহ কীটনাশক মিলিয়াছে ৪০ শতাংশ খাদ্যদ্রব্যেই। গাজর, শিম, টমেটো, লেটুস, কলা, আপেল আনারস, ক্যাপসিকাম, আম, লিচু—কোথায় পড়ে নাই এই বিষের থাবা! নিষিদ্ধ হওয়া কীটনাশক সমূহ বৈধপথে আমদানি করিবার সুযোগ নাই। বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশন-এর মতে প্রতিবেশী দেশসমূহ হইতে চোরাপথে দেশে এই সকল নিষিদ্ধ কীটনাশকের প্রবেশ ঘটে।
চোরাপথে যাহা আসে, তাহার বাজারি চাহিদা থাকিতে হয়। নিষিদ্ধ কীটনাশকের বাজারি চাহিদা রহিয়াছে ফলমূলকে পোকা বা জীবাণুর হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য। এই ভাবে ফলমূল রক্ষা হয় বটে, কিন্তু তাহার পরিণতি হয় সেই গল্পের কুক্কটটির মতো, যাহা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাইয়াছে কিন্তু তাহার সুন্দর নেত্র দুইটি অক্ষত রহিয়াছে। বিষাক্ত কীটনাশকের বদন্যতায় ফলমূলসমূহ কুক্কুটের চক্ষুর ন্যায় আপাতদৃষ্টে সতেজরূপে প্রতিভাত হইলেও তাহা আসলে মৃত বা মৃতবত্। আরও একটি পদার্থ, নিষিদ্ধ না হইলেও, তাহার ব্যাপক ব্যবহারের জন্য জনস্বাস্থ্যের জন্য অতি ভয়াবহ হইয়া উঠিয়াছে। ফরমালিন নামের এই পদার্থটি অণুজীবাণুকে যেইরূপ কঠোরভাবে প্রতিহত করিতে পারে, তেমনিরূপে তাহা মানবশরীরেও ক্যান্সার সৃষ্টির পথ তৈয়ার করিতে পারঙ্গম। ফরমালিন রাসায়নিকটি বিভিন্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি, স্টুডিও, ট্যানারি শিল্প, প্লাস্টিক কারখানায় ব্যবহারের পাশাপাশি প্রাণীর লাশ বা প্রাণীদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কাজে আমদানি করা হয়। আর সেই সুযোগে তাহা কয়েক হাত ঘুরিয়া চলিয়া আসে খোলা বাজারে। তাহার পর মাছ মাংস ফলমূল শাকসব্জি টাটকা ও সতেজ রাখিতে যথেচ্ছ ব্যবহূত হইবার বহু প্রতিবেদন রহিয়াছে। অথচ উন্নত দেশে খাদ্যে ফরমালিন মিশাইবার কথা চিন্তাই করিতে পারে না। ১৯৯৪ সালে আমেরিকার এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সি বলিয়াছে ফরমালিন ফুসফুস ও গলবিল এলাকায় ক্যান্সার সৃষ্টি করে। ইহার পূর্বে ১৯৮৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার’ জানাইয়াছে, ফরমালিন মানবদেহের বিভিন্ন অংশের ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। অর্থাত্ রাসায়নিক যে অতি বিপজ্জনক তাহাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। অথচ ন্যূনতম জনস্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে ফরমালিন এখন কাঁচা বাজারের ব্যবসায়ীদের পরম বান্ধব হইয়া উঠিয়াছে। কেননা, ইহা ব্যতীত অতি সহজে পচনশীল খাদ্য সংরক্ষণ তাহাদের প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়িত। সুতরাং পচনশীল ফলমূল ও খাদ্য সংরক্ষণের আধুনিক ও নিরাপদ ব্যবস্থা ব্যতীত এই বিপদ হইতে উদ্ধার পাইবার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
গবেষণায় জানা গিয়াছে, ম্যালেরিয়া সৃষ্টিকারী মশার যম ছিল অতি বিষাক্ত ডিডিটি। কিমাশ্চর্যম! সেই মশককূল নাকি জিন পরিবর্তন করিয়া প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে পারিয়াছে বিষাক্ত ডিডিটির বিরুদ্ধে! কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ হইল অতিকায় হস্তীর মতো, যাহা খুবই স্পর্শকাতর। ক্ষুদ্র আরশোলা টিকিয়া থাকিলেও কালের গহ্বরে যেমন অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, তেমনটি মশা তাহার জিন পরিবর্তন করিতে পারিলেও মানুষের কাছে এখনও অপরাজিত ক্যান্সার। সুতরাং অনেক দূরারোগ্য ব্যাধিসহ জনস্বাস্থ্যের জন্য এখন মারাত্মক হুমকি যে বিষাক্ত ও ভেজাল খাদ্যদ্রব্য তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।
