মে দিবস :অন্তর্লোক দর্শন

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৫৬
এই মানব সভ্যতা গড়িয়াই উঠিয়াছে মানুষের শ্রমের বিনিময়ে। এক পক্ষের দিক-নির্দেশনায় অপর পক্ষের কায়িকশ্রমে সভ্যতার ইট একটি একটি করিয়া গাঁথা হইয়াছে। সেই গাঁথুনির মধ্যে, সভ্যতার শুরুতে রক্ত ঝরিয়াছে অধিক; সভ্যতা যত আগাইয়াছে রক্তঝরার ধারাও তত কমিয়াছে। মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ, কেহ দাস কেহ মালিক—কয়েক শতক পূর্বেও ছিল বিশ্বের, বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়। শ্রমিক যেন মনুষ্য পদবাচ্য নহে, ছিল ক্রীতদাসতুল্য। সুতরাং তাহাকে দিয়া শুধু উদয়াস্ত নহে, নিরন্তর শ্রমে-ঘামে সিক্ত করিবার বিষয়টি ছিল অতি সাধারণ ঘটনা। সেই ক্রীতদাসতুল্য মানুষের অধিক শ্রমের কোনো বাড়তি মূল্যও ছিল না। ছিল না তাহাদের ব্যক্তিগত জীবনও। পশ্চিমা বিশ্বে ঊনিশ শতকের শিল্প বিপ্লবের সময় অধিকাংশ শিল্পকারখানায় কাজের পরিবেশ ছিল অস্বাস্থ্যকর, ঝুঁকিপূর্ণ ও ভয়াবহ। স্বাস্থ্যহীনতা ও মৃত্যুঝুঁকি ছিল নিত্যসঙ্গী। কাজ করিতে হইত ১২ হইতে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮ ঘণ্টার অধিক। তাহার পর আসিল প্রতিবাদ, দুর্বার আন্দোলন। এবং যুুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর ১৮৮৬ সালের পহেলা মে ইতিহাস সৃষ্টি করিল। অতপর নির্ধারণ করা হইল শ্রমিকের যথোপযুক্ত শ্রমঘণ্টা, শ্রমের মর্যাদা। মে দিবসের ঘটনাটি না ঘটিলে কাহার ক্ষতি হইত সর্বাধিক? সভ্যতা ও শ্রমিকের অন্তর্লোকের দিকে দৃকপাত করিলে যাহা স্পষ্ট হয়, তাহা হইল, ক্ষতি হইত মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের। কেননা, মালিক পক্ষ এই গবেষণালব্ধ জ্ঞানটি তখনও জানিয়া উঠিতে পারে নাই যে, অধিক শ্রমে ব্যক্তির কার্যসম্পাদন ক্ষমতা নষ্ট হইয়া যায়। ক্ষয়প্রাপ্ত হয় সেই দক্ষ ব্যক্তির জীবনকালও। কেননা, সে যন্ত্র নহে। সম্পূর্ণ মানবিক সত্তর সবকিছু সেই শ্রমিকেরও রহিয়াছে। সুতরাং, শ্রমঘণ্টা আট ঘণ্টা নির্ধারণ মানে শ্রমিকের পুনরায় শক্তি সঞ্চয়নের প্রক্রিয়া যথাযথ রাখা, যাহা পরবর্তী নিবিড় ও দক্ষ শ্রমের জন্য সহায়ক। শ্রমিক নিজেও একজন মানুষ বিধায় তাহার ব্যক্তিগত জীবনও একটি অর্থপূর্ণ অবয়ব পায়। সব মিলিয়া বত্সর শেষে যাহা পাওয়া যায়, তাহাতে মালিক ও শ্রমিক—উভয়পক্ষই লাভবান হয়। বিজ্ঞান যত আগাইয়াছে ততই মনুষ্য শ্রমের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ কার্যসম্পাদন করিবার বিষয়টি জাদুঘরে চলিয়া যাইতেছে। এখনই উন্নত বিশ্বের শ্রমনির্ভর বেশিরভাগ কাজ সম্পাদিত হয় বিবিধ ধরনের রোবট যন্ত্র দ্বারা। সেই যন্ত্রই শ্রমিকতুল্য। যন্ত্রটির ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ব্যবহারবিধিতে স্পষ্ট করিয়াছে যে, কাজের অধিক লোড দিলে তাহা বিগড়াইয়া যাইতে পারে। যন্ত্রটির কর্মকুশলতাও হ্রাস পাইতে পারে। সুতরাং ওই যন্ত্রের মালিক নিশ্চয়ই যন্ত্রটিকে এমনভাবে ব্যবহার করিবেন যাহাতে যন্ত্রটি সর্বোত্তম কার্যসম্পাদন করিতে সক্ষম হয়। যন্ত্রটি যাহাতে দীর্ঘদিন কর্মক্ষম থাকে, সেই দিকেও মনোযোগ দেওয়া হয়। যন্ত্রটির কার্যক্ষমতা যদি আট ঘণ্টা পর হ্রাস পাইতে শুরু করে তবে তাহাকে আঠারো ঘণ্টা পর্যন্ত কাজে না লাগাইয়া রিচার্জ করিবার ব্যবস্থা করাই বুদ্ধিমানের পরিচয় নিশ্চয়ই। তবে, এই বিশ্ব দিন দিন এমন এক রূপ পরিগ্রহ করিতেছে যে, কোথাও কোথাও মালিক ও শ্রমিক একাকার হইয়া গিয়াছে। আজকের দুনিয়ায় যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বৃহত্ সংস্থা রহিয়াছে সেইগুলির মালিক কে? অসংখ্য মাল্টি ন্যাশনালকে রহিয়াছে সেইখানে যাঁহারা বিনিয়োগ করেন, তাহারাই মালিক। কাজেই, শ্রমিক-মালিকের সম্পর্কটি আজকের দুনিয়ায় ক্রমশ একে-অন্যের সহিত একীভূত হইয়া যাইতেছে। ইহা পরিবর্তনশীল সভ্যতার নবতর উত্তরণ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল—তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের শিল্পকারখানা এখনও সেই ঊনিশ শতকের মানসিকতা লইয়া বেখাপ্পাভাবে বিকশিত সভ্যতার সহিত তাল মিলাইবার চেষ্টা করিতেছে। মে দিবসে সেই মানসিকতা হইতে উত্তরণ আমাদের কাম্য।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন