স্মরণ

পুরাণ-রূপকথার এক মানুষ যেন

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৫৭
ফরিদপুর শহরে সুব্রত ভট্টাচার্য নামে ছিলেন একজন। শহরের প্রথম আধুনিক স্টুডিও ওরিয়েন্ট স্টুডিও ছিল তাঁর। তখন তিনি স্যুটেড-বুটেড সাহেবী কেতাদুরস্ত এক বাবু-ভদ্রলোক। সরকারি প্রশাসনিক ছবি তোলায় ডাক পড়তো তাঁর তখন। ডিসি সাহেবও ‘সুব্রত বাবু’ বলে খাতির করতেন। শহরের নব্য-অভিজাত মানুষজন শখ করে পোজ দিয়ে ছবি তুলতে আসতো তাঁর স্টুডিওতে। বিবি সাহেবরাও তাদের প্রিয় সুব্রতদাকে দিয়ে ছবি তোলাতেন। কালেভদ্রে ছবি তোলানো ছিল তখন তো মহা-সৌখিন বিলাস এক। আর তা না হবেও বা কেন? পিতা ছিলেন যার চট্টগ্রাম বোয়ালিয়ার সূর্যসেনের বিপ্লবী স্বদেশি-চেলা-খগেন্দ্রলাল ভট্টাচার্য। আর পিতামহ যদিও ছিলেন জোতদার, ভূস্বামী। ব্রিটিশ-হুলিয়া জারি হলে পালাতে হয় পিতৃদেবকে রেঙ্গুনে। সেখানেই জন্ম আমাদের এই রূপকথার এক নায়কের ১৯৪০ সালের ৩ ডিসেম্বরে। আর পিতার চিকিত্সায় সর্বস্বান্ত হয়েই শুরু হয় তাঁর প্রব্রজ্যা। অবশেষে শিকড় গাড়েন তিনি ফরিদপুরে। পরের বাড়িতে কামলা খেটে, গোয়ালঘরে রাত্রিবাস করেও কী করে কেন যেন শিখতে শুরু করেন ছবি তুলতে। একাজে তাঁর গুরু ছিলেন ফরিদপুরের পথিকৃত্ আলোকচিত্রী কালীপদ শীল। হাতেখড়ি আর শিক্ষানবিশী শেষ করে গড়ে তোলেন তিনি শহরে প্রথম আধুনিক ‘ওরিয়েন্ট স্টুডিও’। সে কাহিনী অতীতকালের গর্ভে হারিয়ে গেছে চিরকালের মতো। সংসারে এক চির-সন্ন্যাসী ছন্নছাড়া এই মানুষটি, পাড়া আর সমাজের সুখেদুখে সবার পাশে থেকেও, হাসিঠাট্টা, গল্পগুজবে মাতিয়ে রাখতেন ছোটবড় সকলকে।-যেন সকলেরই তিনি সমান বয়সী। ভিতরে কোথাও তার বড় কাজের হাতছানি দিয়ে ফিরতো। অধরা কোনো করুণাঘন বুদ্ধদেব কি যীশুখ্রিস্টই বুঝিবা। কিংবা একালের মহাত্মা গান্ধী। নইলে কেন পাগল হবেন তিনি ‘যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন’জন-মেথরপট্টির পরম বান্ধব হতে। যার নাম দেবেন ‘বান্ধবপল্লী’-তারাই যে প্রকৃত বান্ধব নগরের। মুক্তিযুদ্ধকালেই কেবল পরিবার-ছাড়া হয়ে ফিরেছেন দিগ্বিদিক ; ট্রেনিংও নিতে গেছেন, যুদ্ধে যাওয়া যদিও হয়নি তাঁর। ’৬৫ সালে জনাকয়েক ছাত্রলীগ কর্মীর গ্রেফতার ঠেকিয়েছেন তিনি প্রশাসনের সঙ্গে ওঠাবসার সুবাদে। বঙ্গবন্ধুর ছবি তোলা সূত্রে আর দু’জনের সমস্বভাবের জোরে হয়ে উঠেছিলেন আদরের ভাইটি তাঁর। দু’জনের হাসিমুখ ছবিও সাক্ষ্য দেবে সে সম্পর্কের, স্টুডিওর শো-কেসে দেখেছি সে ছবি। যুদ্ধকালেই পাকিস্তানি সৈন্যের হাতে পড়ে পরিবার। ছোটভাই প্রাণ বাঁচাতে মিথ্যে পরিচয় দিতে থাকেন। আর তখন গর্জে ওঠে স্বদেশী বিপ্লবী সূর্যসেনের চেলা, তার বৃদ্ধ পিতা: ‘মৃতুকালেও যে সত্য হতে ভ্রষ্ট হতে নেই রে’-ছুটে বাইরে এসে ঘাতকের সামনে দাঁড়ান সেই পৌরাণিক ধর্মপুত্র- ‘এই দেখেন আমার পৈতা, আমি হিন্দু ব্রাহ্মণ।’ অবধারিত গুলিতে লুটিয়ে পড়েন সত্যসাধক বৃদ্ধ পিতা।-এই না হলে কি আর হতে পারেন তিনি পুরাণ-রূপকথা নায়কের পিতা! রচিত হবে কী করেই বা পৌরাণিক আখ্যান এক? প্রথাগত কোনো ধর্ম মত-পথেই তো মতি ছিল না তাঁর কোনোকালেই। এহেন ধর্মহীন ব্রাহ্মণ ছিলেন তো ছুঁত্মার্গ হিন্দুসমাজের চক্ষুশূল, দু’চোখের বিষ। সেই তিনি কী করে সংসারত্যাগী—বিবাগী হয়ে ব্রাহ্মণকান্দার আশ্রম, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড মন্দির আর সবশেষে পশ্চিমবঙ্গ শঙ্কর মঠের মহারাজ হয়ে দেহদান করে যান হাসপাতালে- ৩ এপ্রিল ২০১৪। আঙ্গিনার জগত্প্রভু আশ্রমেও উচ্চনিচ ভেদাভেদ যাকে অত পীড়িত করতো? সংসার আর সমাজের দুই নৌকায় পা দিয়ে তিনি কি কোথাও মনে মনে সর্বস্বান্ত হয়ে উঠছিলেন? দেশপ্রেমিক এই মানুষটি, যিনি কিনা জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদ মানতেন না—অভেদ এই সাধক-প্রেমিক-পাগল মানুষটিকেও তো শুনতে হয়েছে—‘মালাউন’। নব্বুইয়ের দশকে এক ওসি দিয়েছিলেন তাঁকে হিতউপদেশ: সুব্রত বাবু মালাউন হয়ে কেন এত ঝামেলায় জড়ান? নির্ঝঞ্ঝাট, নির্বিরোধী হয়ে উঠুন না আর সব স্বধর্মীয়র মতো? এই মর্মাঘাতই কি কাল হয়ে ওঠে তাঁর শেষ পর্যন্ত?—সর্বস্বান্ত হয়েই দেশ ছাড়েন, পরিবার ছাড়েন—সমাজ ছেড়ে আশ্রয় নেন তার স্বভাব-বিরুদ্ধ আশ্রম-মঠে-মন্দিরে। হয়ে ওঠেন মহারাজ! স্বভাবের কবচকুণ্ডল হারিয়ে কোন পরশ পাথরের খোঁজে? পৌরাণিক পরাক্রান্ত হেন রূপকথার নায়কের এ-কি কেবলই ব্যক্তিগত পরাজয়, হার? নির্বাণ ভূমায় তাই কি এমন নিরুপায় আত্মসমর্পণ? ‘কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো্/সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো, পাগল ওগো ধরায় আসো?’ লেখক : কবি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন