অগ্নিধাক্কা দিয়ে সে সবাইকে জানিয়ে দেয় “আমি বৈশাখ মাস”। দুপুর হলেই সবাই আপনা-আপনিই তা বুঝতে পারে। কি গ্রাম, কি শহর সর্বত্রই খাঁ খাঁ। দূরে তাকালে মনে হয় মরীচিকা চিক চিক করছে। দুঃসহ গরমে যেন সব আরাম, আয়েশ মরীচিকা হয়ে গেছে। দুপুরে বাইরে শুধু অগ্নি ঝরে। আকাশে মেঘের ছায়াটুকু পর্যন্ত দেখা যায় না। ধু-ধু রুক্ষ দু’চোখে প্রখর অগ্নিদাহ নিয়ে ক্রুদ্ধ আবির্ভাব ঘটে গ্রীষ্মের এই রুদ্র-তাপসের। নিদাঘ সূর্যের অগ্নিবাণে ধরিত্রীর মৃন্ময় বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে যায়। শুষ্ক হয়ে যায় মৃত্তিকার প্রাণরস। ঘরের বাইরে যাবার জো নেই। যেন মহাপরাক্রমশালী দেব-দৈত্য শত-শত মুখে আপন তেজস্ক্রিয়তা সর্বশক্তি দিয়ে ছড়াচ্ছে।
উত্তপ্ত ধূলিমাখা ঝাঁঝালো বাতাস বড় অসহ্য লাগে। ঘরের বাইরে গেলে তৃষ্ণায় বুক ধড়ফড় করে। বৃষ্টির জন্য চারিদিকে হাহাকার। কিন্তু মেঘদূত তখন নিরুদ্দেশ। পানির অভাবে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির। সকলে তখন আকাশের পানে তাকিয়ে—
“আল্লাহ মেঘ দে পানি দে
ছায়া দে রে তুই
আল্লাহ মেঘ দে।”
এরপর বিদ্যুত্ ও গুরুগম্ভীর বজ ধ্বনির অতি-ভৈরবী হরষের মধ্যে সূচিত হয় তার শুভাগমন। পৃথিবী হয় শীতল। শহরের মানুষগুলো যেন যন্ত্রের মত; রোবটের মতো। অবসর নেই, আলস্য নেই, নেই কোন আনন্দ। অবশ্য যাদের রুমে এসি, গাড়িতে এসি, অফিসে এসি তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা দরিদ্র, মধ্যবিত্ত তারা বোঝে গরমের অসহনীয় জ্বালা কাকে বলে। ঠা ঠা পড়া রোদ সেখানে পিচঢালা রাস্তাকে আরো অগ্নিময় করে তোলে। শাহবাগ মোড়, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে ঘন্টার পর ঘন্টা বস্তাবন্দি হয়ে বাসের মধ্যে বসে থাকা, এ কষ্টের বর্ণনা বলে শেষ করা যায় না।
প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি পেতে কদর বেড়েছে বরফ কুচি-মেশানো শরবতের। ঠাণ্ডার পরশ পেয়ে সাময়িক স্বস্তি মিলছে ঠিকই, তবে নিজেদের অজান্তেই শরীরে চলে যাচ্ছে জন্ডিসের জীবাণু। রাস্তার এ শরবত খুবই অস্বাস্থ্যকর। এতে শরবত পানকারীরা ডায়রিয়া, আমাশয় ও জন্ডিসের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ এ শরবতে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে না। আবার খোলা জায়গায় ধূলা-ময়লামিশ্রিত খাবারে হেপাটাইটিস জীবাণু চলে আসতে পারে। আবার একই গ্লাস দিয়ে অনেকেই পান করে থাকে। এতে পানকারীদের কেউ হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাসে আক্রান্ত থাকলে গ্লাসে ভাইরাস লেগে থাকতে পারে এবং সুস্থ মানুষের দেহে চলে যেতে পারে। এভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে হেপাটাইটিস। একইভাবে পানিতে অথবা গ্লাসে ডায়রিয়া ও আমাশয়ের জীবাণু থাকতে পারে। সুতরাং সাবধান!
আবার অফিস-আদালতে যারা মিনারেল ওয়াটার খাচ্ছেন তাদের অনেকেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। দেখা যায়, বাজারজাতকৃত বেশিরভাগ মিনারেল ওয়াটার ওয়াসার কিংবা অনিরাপদ পানি বোতলজাত করে বিক্রি করছে। কাজেই সব কথার শেষ কথা হল— এ সময় ঘামের সঙ্গে প্রচুর লবণ শরীর হতে বের হয়ে যায়, তাই প্রচুর লবণমিশ্রিত পানি খেতে হবে। ওরস্যালাইন সেবন করা ভাল। রাস্তাঘাটে শরবত না খাওয়া ভাল। রাস্তার পাশে কিংবা যত্রতত্র খোলা ও বাসি খাবার না খাওয়া ভাল। পানি ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। হালকা ঠাণ্ডা পানি পান করা ভাল। সূতির হালকা জামা-কাপড় পরা উচিত।
চলছে তীব্র দাবদাহ। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। গরম বাতাস শরীরে লাগছে আগুনের হলকার মতো। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে সূর্যের তাপ। তাই এ থেকে আমাদের পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় বের করতে হবে।
লেখক :এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার,
সোনালী ব্যাংক লিমিটেড
