এই নৃশংসতা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। সংবাদপত্রে যেইটুকু বিবরণ প্রকাশিত হইয়াছে তাহা পাঠ করিয়া সুস্থ ও বিবেকবান মানুষমাত্রই অসুস্থ বোধ করিবেন। ঘটনার শিকার মাসুদ ও টগর নামের হতভাগ্য দুই তরুণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। গত রবিবার মাদার বখশ হল হইতে রিকশায় করিয়া ক্যাম্পাসে যাইবার পথে প্রথমে ছাত্রলীগের এই দুই নেতা-কর্মীর উপর ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। ইহার পরপরই অজ্ঞাত পরিচয়ের সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা চতুর্দিক হইতে হায়েনার মতো তাহাদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়ে। ধারালো চাপাতি দিয়া নির্দয়ভাবে কোপাইয়া বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলা হয় মাসুদের দুই পা। কাটিয়া দেওয়া হয় দুই হাতের রগ। রক্ষা পায় নাই টগরের হাত—পায়ের রগও। উভয়ের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। আক্রান্ত দুই ছাত্র এই হামলার জন্য ইসলামী ছাত্র শিবিরকে দায়ী করিয়াছেন। ছাত্রলীগের অভিযোগের অঙুলিও তাহাদের দিকেই। স্থানীয় মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলিয়াছেন যে, হামলার ধরন, আলামত ও প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তাহাদের ধারণা; ছাত্রশিবিরই এই হামলা চালাইয়াছে। তবে কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করিয়া বুকভরা আশা লইয়া যাহারা তাহাদের সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাইয়াছেন, তাহারা এইসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনিতে শুনিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছেন। তাহারা দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দেখিতে চাহেন। চাহেন শিক্ষাঙ্গনে সর্বপ্রকার হানাহানির অবসান। সর্বোপরি, তাহাদের সন্তানদের নিরাপত্তা। আপামর দেশবাসীর প্রত্যাশাও ইহার ভিন্ন নহে।
অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, যতো দিন যাইতেছে হিংস্রতা ও বর্বরতার ক্রমবর্ধমান তাণ্ডবের নীচে চাপা পড়িয়া যাইতেছে তাহাদের সকল প্রত্যাশা। অসহায়ভাবে আপন সন্তানের ক্ষতবিক্ষত লাশ বহন করা কিংবা টগবগে একটি তরুণের করুণ পঙ্গুত্ব প্রত্যক্ষ করাই যেন হইয়া উঠিয়াছে আমাদের নিয়তি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে হাতাহাতি-মারামারির ঘটনা স্বাধীনতার আগেও ঘটিয়াছে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু খুনখারাবির দৃষ্টান্তও বিরল নহে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে প্রতিপক্ষের হাত-পায়ের রগ কাটিয়া দেওয়ার মতো বর্বরতার সূত্রপাত ঘটিয়াছে কয়েক দশক আগে। ইহার জন্য বিশেষ একটি ছাত্র সংগঠনকে দায়ী করা হয়। ইতোমধ্যে সারাদেশে অনেকেই অনুরূপ বর্বরতার শিকার হইয়াছেন। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ১৫ জন নেতা-কর্মীর হাত ও পায়ের রগ কাটিয়া দেওয়া হইয়াছে গত পাঁচ বত্সরে। অবশ্য অভিযোগের আঙুল যাহাদের দিকে তাহারা বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করিয়া আসিতেছেন। আর যাহাদের দায়িত্ব ছিল কাহারও মুখের দিকে না তাকাইয়া দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, অজ্ঞাত কারণে তাহারাও এই ব্যাপারে বিস্ময়কর নির্লিপ্ততার স্বাক্ষর রাখিয়া চলিয়াছেন। ফলে দায়ী ব্যক্তিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু যে ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থাকিয়া গিয়াছে তাহাই নহে, অধিকতর দানবীয় রূপে তাহাদের প্রত্যাবর্তনও ঘটিতেছে।
এই মুহূর্তে যেই প্রশ্নটি সবকিছুকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে তাহা হইল, রাজনীতির নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই নৃশংসতা কি চলিতেই থাকিবে? অকালে একের পর এক বলি হইতে থাকিবে আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণরা? খালি হইতে থাকিবে মায়ের কোল? সমাজ সোচ্চার না হইলে, নীতিনির্ধারকদের বোধোদয় না ঘটিলে এবং সর্বোপরি, আইন তাহার নিজস্ব গতিতে না চলিলে নৃশংসতার এই দানবকে নিরস্ত করা যে সম্ভব নহে— তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। ধিক্কার বা নিন্দা জানাইয়া কিংবা সহমর্মিতা প্রকাশ করিয়া শুধু কিছুটা সান্ত্বনা হয়তো পাওয়া যাইতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা দেশের শিক্ষাঙ্গণে সর্বপ্রকার হানাহানি ও বর্বরতার অবসান।
