পাঁচটি মানবিক মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিত্সা অন্যতম। উন্নত ও উন্নয়নশীলসহ প্রায় সকল দেশের সরকারকেই ইহার গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী বাত্সরিক বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় চিকিত্সাসেবা খাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিশেষায়িত চিকিত্সাসেবা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেন যাহা ‘ওবামা কেয়ার’ নামে খ্যাত। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের চিকিত্সা খাতে যেমন সার্বজনীন চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করিবার ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ লক্ষ্য করা যায়, তেমনি চিকিত্সাসেবার মানের দিকটিও বেশ গুরুত্ব পাইয়াছে। বাংলাদেশও চিকিত্সা খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করিয়াছে। সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসাবে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমাইয়া আনা সম্ভব হইয়াছে। ইহা লক্ষ্যমাত্রার অধিক প্রায় ৭৫ শতাংশ হারে কমিয়াছে। দূর হইয়াছে পোলিও। ইহাছাড়া স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামোতে আমূল উন্নয়নের ফলে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত চিকিত্সাসেবা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হইয়াছে। ২০১১ সালের স্বাস্থ্যনীতির সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া গৃহীত ‘২০১২-২০৩২ স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন কৌশলপত্র’ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার যেখানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং ইহার সুষম ব্যবহারের জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করা হইয়াছে। ইতোমধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় স্বাস্থ্যক্লিনিক স্থাপন করা হইয়াছে যেইখানে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হইতেছে। কিন্তু লক্ষণীয় যে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সার্বজনীন এবং উন্নতমানের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হইতেছে না। ইহার জন্য প্রধানত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং গ্রামীণ পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করিতেছেন বিশেষজ্ঞগণ।
পত্রিকান্তরে জানা যায়, চিকিত্সাখাতে ক্রমাগতভাবে দুর্নীতি বাড়িয়া চলিয়াছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কেহ কেহ রাজনৈতিক প্রভাব খাটাইয়া চিকিত্সাখাতের শত শত কোটি টাকা হাতাইয়া লইতেছে যাহা নাগরিক চিকিত্সাখাতে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করিয়াছে। আর্থিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে কাঠামোগত ত্রুটির ফলে চিকিত্সা সরঞ্জামাদি ক্রয়কালে দুর্নীতির অভিযোগ রহিয়াছে দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণের বিরুদ্ধে। নিয়মিত সরকারি পর্যবেক্ষণ এবং সত্ ও দক্ষ পরিদর্শকের অভাবেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইহেন চুরি-দুর্নীতির ঘটনা ঘটিতেছে। আবার অতি উচ্চ মূল্যে ক্রয়কৃত চিকিত্সা যন্ত্রপাতি হয় অব্যবহূত থাকিয়া যায়, না হয় অদক্ষ হাতে ব্যবহূত হইবার ফলে ইহার কার্যকারিতা দ্রুত নষ্ট হইয়া যায়। পক্ষান্তরে উন্নত চিকিত্সাসেবা প্রাপ্তির লক্ষ্যে লক্ষাধিক রোগী পাড়ি জমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ইহাকে আমাদের চিকিত্সা ব্যবস্থার প্রতি অনেক ক্ষেত্রে বিত্তবানদের আস্থার সংকট রূপে গণ্য করা যায়। তাহাছাড়া সরকারি চিকিত্সকদের অনেকেই পেশাগত কারণে গ্রামে যাইতে অনীহা দেখান। ইহার কারণ শহুরে উন্নত নাগরিক সেবা পাওয়া যায়। তাহাছাড়া শহর এলাকায় প্রাইভেট প্রাকটিসের বাড়তি সুবিধাতো আছেই। ফলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাইয়া শহরে থাকিয়া যাইবার প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এইভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামো থাকিবার পরও উন্নত গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হইতেছে না। ইহাতে জনমানসে সরকারের প্রতি একধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হইতেছে। বস্তুত উন্নত নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করিবার জন্য শুধু প্রকল্প প্রণয়নই নহে, প্রয়োজন ইহার শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
যাহা হউক, বর্তমানে চিকিত্সাখাতের ব্যাপকভিত্তিক উন্নয়নসাধনের লক্ষ্যে বেশকিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হইয়াছে। গ্রামে প্রেরিত সরকারি চিকিত্সকদের জন্য অধিক বেতন-ভাতাদির ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগের কথা বলা হইতেছে যাহা বাস্তবায়িত হইলে চিকিত্সকদের গ্রামে যাইবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান অনাগ্রহের মাত্রা কমিয়া আসিতে পারে। চিকিত্সাখাতকে দলাদলির প্রভাবমুক্ত করিবার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কাজেই স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম দূরীকরণ এবং সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও ক্ষেত্রবিশেষে কঠোরতা অবলম্বন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
