আলোকপাত

একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও শিক্ষার অগ্রগতি

আপডেট : ০২ মে ২০১৪, ২১:৪১
গত দুই দশকে দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের গরিব-দুঃখী মানুষের ছেলে-মেয়েরা স্কুলমুখী হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকার ও ইউনিসেফসহ বিশ্বের বিভিন্ন দাতাসংস্থা অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর অংশ বেসরকারিভাবে দান, চাঁদা ও ছাত্র-ছাত্রীদের দেয়া নগণ্য বেতনের ওপর নির্ভরশীল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্বপাশে, কুমিরা রেল স্টেশনের পশ্চিম পাশে পাহাড়ের পাদদেশে ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে হাঁটি হাঁটি পা পা করে গড়ে ওঠেছে অত্র অঞ্চলের প্রিয় বিদ্যাপীঠ কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ। খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ আলহাজ্ব নজির আহম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বে, স্থানীয় কিছুসংখ্যক শিক্ষানুরাগীর সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আলোর পথ দেখেছে এই শিক্ষায়তন। সীতাকুণ্ড অনেক কীর্তিমান পুরুষের জন্মস্থান। তাদের নামের সাথে কৃতিত্ব হচ্ছে এই এলাকার নাম। এই আত্মত্যাগী মহান লোকটির স্থায়ী নিবাস চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানায়। তিনি যতটা আনোয়ারার তার চাইতে অনেক বেশি কুমিরার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত, পুরস্কৃত ও অভিনন্দিত হয়ে তিনি কুমিরার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। কুমিরা এলাকায় ইতোপূর্বে প্রতিষ্ঠিত মৃতপ্রায় কুমিরা হাই স্কুল নবজীবন লাভ করে আলহাজ্ব নজির আহমদ চৌধুরীর জাদুস্পর্শে। ব্যতিক্রমধর্মী আবাসিক স্কুল হিসেবে শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পরিচিতি লাভ করে। এই মহান শিক্ষকের প্রচেষ্টায় কুমিরা আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছে বিভিন্ন ট্রাস্ট, ইসলামী কমপ্লেক্স, আবাসিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। অনেক চড়াই-উত্রাই পার হয়ে বর্তমানে স্কুল অ্যান্ড কলেজটি একটা শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এতো সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থাকা সত্ত্বেও আমাদের রয়েছে কিছু কিছু সমস্যা। দীর্ঘ ৯ বছরেও কলেজ শাখা এমপিওভুক্ত না হওয়ায় কলেজ শাখার শিক্ষকবৃন্দ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্কুল-কলেজের ছাত্রী সংখ্যা বাড়ার কারণে শ্রেণীকক্ষের অভাব রয়েছে। তাই সুষ্ঠু পাঠদানের জন্য নতুন ভবন কিংবা শ্রেণী কক্ষ তৈরি করা দরকার। স্কুল অ্যান্ড কলেজের উভয় পাশে রয়েছে বড় বড় স্টীল মিলস ও সিমেন্ট কারখানাসহ অনেক ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। মিল-কারখানাগুলোর বিষাক্ত ধোঁয়া, গ্যাস এবং প্রচণ্ড শব্দ শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করে। এর আশু সমাধান প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে পানির প্রকট সমস্যা। নিজস্ব ডিপ টিউবওয়েল নেই। তা বসালেও পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই সমস্যা সমাধানে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। স্কুল অ্যান্ড কলেজের লেখাপড়ার মান ক্রমান্বয়ে উন্নতি লাভ করছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকবৃন্দ প্রশিক্ষণের আলোকে উপকরণ ব্যবহার করে এবং মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। একাত্তরে আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার ছিলো ১৬ দশমিক আট শতাংশ। এখন তা ৭০ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার ছিলো বিশ্বে সবচাইতে কম। তখন ৮০% নারীই ছিলো অশিক্ষিত। অথচ বর্তমানে আমাদের ৫০% এর বেশি নারী শিক্ষিত। এদিকে মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের শিক্ষাগ্রহণে দক্ষিণ এশিয়ায় এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে। দশ বছর আগে আমাদের দেশে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ছিলো ৬১ শতাংশ। এখন শতভাগ শিশু স্কুলে যায়।অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শিক্ষা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। সব মা-বাবাই এখন তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেছেন। আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। আমাদের দেশে মেধাবী, কৃতী ব্যক্তিরা শিক্ষকতার পেশার প্রতি আকৃষ্ট হন না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ অবস্থার উন্নয়নে সরকার পদক্ষেপ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুলই বলা চলে। আধুনিক সভ্যতা, প্রগতি, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ইত্যাদি বিজ্ঞান শিক্ষা, গবেষণা ও চর্চা নির্ভর। কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ালেখা করার ব্যাপারে একটা লক্ষণীয় অনীহা আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দৃশ্যমান। সে কারণে আমরা উন্নতি অগ্রগতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। এ ব্যাপারে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সময়ের দাবি। আমাদের মেয়েরা এখন শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক অগ্রসর। ওদের জন্য বিজ্ঞান শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে তাদের কর্মসংস্থান অনেক বেড়ে যাবে। এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  লেখক:হূদরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন