ইসরায়েল লইয়া জন কেরির কড়া মন্তব্য প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৩ মে ২০১৪, ২১:৫৪
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল অশান্তি নিরসনে নয় মাস দীর্ঘ আলোচনাপর্বের ব্যর্থতায় সম্প্রতি একান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। সদ্য সমাপ্ত আলোচনাপর্বের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ, রাশিয়া ও জাপানের একদল বিশ্লেষক ও কর্মকর্তার সহিত আলাপকালে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে কড়া নেতিবাচক মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাইলেটারাল কমিশন নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকটির আলাপ-আলোচনা সংবাদমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত না হইলেও যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য বিস্ট’ নামক একটি ওয়েবসাইট কথোপকথনের একটি রেকর্ড হস্তগত করিতে সক্ষম হয় বলিয়া জানা যায়। এইবারের আলোচনার ব্যর্থতা লইয়া কেরির কিছু কথাবার্তার মধ্যে অবশ্য নূতনত্ব নাই। এই ব্যর্থতার জন্য তিনি যথারীতি উভয় পক্ষকেই দায়ী করিয়াছেন। তবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের নেতৃত্ব পর্যায়ে পরিবর্তন আসিলে অবস্থার উত্তরণ ঘটিতে পারে বলিয়া মন্তব্য করিবার মাধ্যমে বিদ্যমান অচলাবস্থার ব্যাপারে নিজের অথবা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কিছুটা অস্থির হইয়া উঠিবার প্রমাণ দিলেন বৈকি। কেরি অবশ্য এইখানেই স্থির থাকেন নাই বরং যুক্তরাষ্ট্রের দিক হইতে এতদিন অবধি সচেতনভাবেই অনুচ্চারিত একটি ভাবনারও প্রকাশ ঘটাইয়া দিয়াছেন। কেরি মনে করিতেছেন যে, বর্তমান অবস্থা চলিতে থাকিলে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ভবিষ্যত্ পরিণতি বর্ণবাদী আমলের দক্ষিণ আফ্রিকার মত হইয়া উঠিতে পারে যখন শ্বেতকায় মানুষেরা কৃষ্ণাঙ্গদিগকে সরকারিভাবেই অচ্ছুত্ করিয়া রাখিত। ইতোমধ্যে তাহার কিছু আলামত দেখা যাইতেছে। যেমন ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিতে আইন প্রণয়ন করিতে যাইতেছে দেশটি। উগ্রপন্থিদের এই বিতর্কিত দাবির প্রতি আরো শক্ত অবস্থান গ্রহণ করিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে এমন কিছু ঘটিয়া গেলে ইসরায়েল যে শান্তিতে থাকিতে পারিবে না তাহা লইয়াও হুঁশিয়ারি জানান দিয়া রাখিয়াছেন জন কেরি। উল্লেখ্য, শান্তি আনয়নে দুই পক্ষের মধ্যে দূতিয়ালী লইবার প্রথম কিছুদিন এক প্রকারে চলিলেও পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের জায়নবাদী কর্তৃপক্ষ কেরির ব্যাপারে নানা ধরনের বক্রোক্তি করিয়া শান্তি প্রক্রিয়াকে স্পষ্টতই ধীর গতি করিয়া দিবার পথেই হাঁটিয়াছে। কেরি এইবারও নূতন করিয়া আরো একটি পুরানো কথাই বলিয়াছেন। তিনি মনে করিতেছেন যে, দুই-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত আর কোনভাবেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিবাদের মীমাংসা হইতে পারে না। আর এই প্রকার সমাধান না হইলে সাধারণ ইসরায়েলী ও সাধারণ ফিলিস্তিনীদের নিরাপত্তাহীনতা উত্তরোত্তর বাড়িয়া চলিবে বলিয়াও মনে করিতেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জন কেরির এই সমস্ত কথাবার্তা কতখানি ব্যক্তিগত আক্ষেপ আর কতখানি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের মতামতের প্রতিফলন তাহা স্পষ্ট হইতে কিছুটা সময় লাগিবে। কিন্তু তাই বলিয়া সময়ক্ষেপণ করিতেছে না জায়নবাদের বন্ধুরা। কেরির কথাবার্তা প্রচার হইতে না হইতেই তাহারা মাঠে নামিয়াছে এবং শান্তি-প্রক্রিয়ায় কোন অগ্রগতি না হইবার জন্য তাহাকেই দায়ী করিতে শুরু করিয়া দিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, কংগ্রেসের ইসরায়েল বিষয়ক জরুরি কমিটির প্রধান উইলিয়াম ক্রিস্টাল ইসরায়েল বিষয়ে কেরির মন্তব্যের সমালোচনা করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই বরং কেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব হইতে ছাঁটাই করিয়া দিবার জন্যও বারাক ওবামার প্রতি আহবান জানাইয়াছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলী জায়নবাদের মিত্রের সংখ্যা যে অনেক তাহা তথ্যাভিজ্ঞ মহল সকলেই জানেন। সোমবার নাগাদ কেরির বক্তব্য ফাঁস হইয়া যাইবার পর হইতে তাহার আরেক দফা প্রমাণ দেখাই যাইতেছে। কয়েক মাস পরে কংগ্রেসে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এমন এক সময়ে পরাক্রমশালী জায়নবাদী লবিকে ওবামা খেপাইয়া তুলিবেন কিনা তাহা লইয়া সন্দেহ আছে। তবে ক্ষমতা হইতে বিদায় লইবার আগে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করিতে চাহিয়া ওবামা যদি ন্যায্য রাস্তায় হাঁটিতে মনস্থ করেন, তাহা হইলে জায়নবাদী অচলায়তন ভাঙিবার একটি সম্ভাবনা তৈরি হইলেও হইতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন