বিপন্নতায়ও বেঁচে থাকো ডাকঘর

আপডেট : ০৩ মে ২০১৪, ২২:০০
খবরটা শুনেই চমকে উঠেছিলাম, পুঁজির দেশে ইমোশান বা আবেগের মূল্য কম, চাকরি থেকে শুরু করে বিয়ে, প্রেম এমন কি জন্ম-মৃত্যুতেও। দেখতে পাই অনেক সময়ও ধোপদুরস্ত ইস্ত্রি করা কালো পোশাক পরতে ভোলে না। জন্মদিনের কেক বা মোমের আলোয় যতটা উল্লাস,আন্তরিকতায় ততটা নেই। এটাই বোধকরি নাগরিক সভ্যতা, অন্তত বিশ্বায়নের নামে বদলে যাওয়া দুনিয়ায় এটাই বাস্তবতা, এমন দেশ ও সমাজে দরকারের বাইরে কিছু নেই, খবরটা তেমনি এক আতঙ্ক ও ভয় জাগানিয়ার, অস্ট্রেলিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে প্রতিদিন তাঁরা আর ডাক হরকরা বা পোস্টম্যান পাঠাবে না। সব অঞ্চলে তো নয়ই, কোথাও সপ্তাহে চারদিন, কোথাও পাঁচদিন কোথাওবা তিনদিন ডাক বিলি করা হবে, যার মানে, আগের মত চিঠি-পত্রের ব্যস্ততা নেই, ব্যস্ততা নেই পত্র বিনিময়, পার্সেল বা অন্যকিছুরও। ব্যবসার দিক থেকে এটি দরকারী, উপকারী না অপ্রয়োজনীয়— আমি সে বিবেচনায় যাব না, আমার মনে পড়ছে সতের বছর আগের কথা, অভিবাসী হয়ে এসেছি অস্ট্রেলিয়ায়, দু’একটি পরিচিত ফুল, মাঝে মাঝে হঠাত্ উড়ে আসা খয়েরি শালিক, সাদা বক, নীলাকাশ, দিনের সূর্য ব্যতীত কিছুই চিনি না, চেহারা আদলে ধবধবে ফর্সা চোস্ত ইংরেজি বলা মানুষদের দেখলে ভালো লাগতো বটে, আপন মনে হতো না, বরং এক ধরনের অবিশ্বাস আর সন্দেহ ভয় কাজ করতো মনের গহীনে, অভিবাসন তথা নির্বাসনের সেই দুঃসময়ে আমার সবচেয়ে পরিচিত হয়ে ওঠা মানুষটি আসতো ঠিক দুপুরবেলায়, কোন ব্যতিক্রম ছিল না, শনি, রবিবার বাদ দিয়ে প্রতিদিন মধ্যাহ্নে মটর সাইকেল চালিয়ে আসা মানুষটির গায়ে থাকতো লাল হলুদের জামা আর খাকি হাফপ্যান্ট। প্রথম প্রথম আমার ওপর ভয়ানক রাগ ছিল তার, প্রশ্ন করলে মাথা না তুলে অথবা অন্যদিকে তাকিয়ে জবাব দিতো, কণ্ঠেও ছিল না কোন ধরনের আবেগ বা সহানুভূতি। এক প্রশ্নের বারংবার উত্তর দিতেইবা কার ভালো লাগে? দেশের সাথে যোগাযোগ তখন দুঃসাধ্য, না ছিল মোবাইল, না কম্পিউটার ছিল, না ফেইস বুক, ইমেইল, টুইটার জাতীয় কিছু। সদ্য ফেলে আসা দেশ ও স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করার একমাত্র মাধ্যম তখন চিঠি। তার এই ভদ্রলোকটি ছিলেন ডাক হরকরা, চোখে সানগ্লাস, হাফ পাতলুনে হাঁটুঅব্দি মোড়ানো মোজায় দেখা আধুনিক পোস্টম্যান। একবার তার সাথে আমার বেশ ভালো একটা সম্পর্ক হয়ে যায়, মাঝে মাঝে দু’চার মিনিট আড্ডাও হতো একসাথে, মটর সাইকেলের চারধারে ব্যাগ আর থৈ থৈ চিঠিপত্রের ভাঁজে ব্যস্ত মানুষটি চলে গেলে আমি আবারো একা হয়ে পড়তাম। খবরটি জানার পর থেকে এই মানুষটির কথা মনে পড়ছিল, বারবার চোখের পর্দায় ভেসে আসছিল তার সানগ্লাস পরা ব্যস্ত মুখখানি। ডাকঘর ও ডাকবাবু নামে পরিচিত পোস্টঅফিস অনুষঙ্গ আমাদের জীবনে অর্থাত্ বাঙালির জীবনে প্রাচীন। তারাশঙ্কর থেকে রবীন্দ্রনাথ, সুকান্তের কবিতা- হেমন্তের তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রানার ছুটেছে রাতে খবরের বোঝা হাতের আমাদের কবিতা, উপন্যাস, সাহিত্য, গানে চিরকাল আদৃত। আমাদের কৈশোর যৌবন এমনকি এই সেদিনও আমরা ছিলাম পুরোই ডাকঘরনির্ভর, চট্টগ্রাম জিপিওর তখনকার ডাকপিওন থেকে সিনিয়র অফিসাররা আমাদের নামে না জানলেও চেহারায় চিনতো, প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সাড়ে এগারটায় একঝাঁক তরুণ ভিড় জমাচ্ছে, নিজেদের চিঠি ঢাকার কাগজ, বরিশাল, সিলেটের ম্যাগাজিন বা জরুরি কিছু , দুপুরে ডাকপিওন যাবার আগেই বাড়ি নিয়ে যেতে লাইন ধরে আছে, এ দৃশ্য এমন সিনেমা বা স্বপ্নেও ভাবা যায় না। জীবনের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে আধুনিকতার নামে যন্ত্রের অত্যাচারে ধ্রুপদী জীবন উধাওপ্রায়। রেডিও, গ্রামোফোন, চিঠি, কাগজ, লাইব্রেরী, বই, খাতা, পেন্সিল— সবকিছুই আক্রান্ত আজ, একথা বলি না আমরা আধুনিকতার সাথে চলব না, চলব অবশ্যই, কিন্তু ্এটাও মনে রাখতে হবে বিজ্ঞানের জায়গা প্রযুক্তিকে দেব না, লাইব্রেরীর আসনে গুগলকে বসাবো না, গ্রামোফোনের জায়গা ছেড়ে দেব না, কানে বুদ ফুলের মত সারাক্ষণ গুঁজে রাখা ছোট যন্ত্রকে। যে কথা বলছিলাম, ঐতিহ্যবাহী, প্রাচীন ও সভ্যতার হাত ধরে চলা ডাকব্যবস্থা আজ ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি। অস্ট্রেলিয়া পোস্টের মত পুরনো ডাকব্যবস্থাও পড়েছে তোপের মুখে, দিনে একাধিকবার চিঠি বিলি করতে আসা স্বপ্নের ডাক হরকরা নাকি সপ্তায় একদিন বা দু’দিন ধরা দিবে, এরপর কি ধীরে ধীরে উধাও হয়ে যাবে তারা? সেসব আলোক জ্বালানো মানুষের মত যারা রাজপথে গলির মোড়ের লণ্ঠনে সন্ধ্যায় আলো ধরিয়ে যেতো? সেসব বাতিওয়ালা আজ অতীত। ডাকঘর ও ডাক হরকরার এমন পরিণতি চাই না আমরা, চাই না বললেই তো হবে না, কিছু জরুরি কাজও করতে হবে আমাদের। উন্নত দেশের পোস্ট অফিসগুলো এখন শপ, হেন জিনিস নেই যা পাওয়া যায় না। ফেব্রুয়ারি মাসে হাওয়াই গিয়েছিলাম, এক অপরাহ্নে হঠাত্ একটি কাঁচির প্রয়োজন পড়লো, এবিসি শপ নামের মুদি দোকানে জুতা থেকে টুপি সব পাওয়া গেলেও কাঁচি মিলল না, কাউন্টারের তরুণীই বাতলে দিল উদ্ধারের পথ, ‘যাও পাশের পোস্টাপিসেই পেয়ে যাবে’, হাওয়াই দ্বীপের সেই ডাকঘরে ঢুকে কেবল একটি কাঁচি নিয়ে বের হওয়া সাধারণ কোন মানুষের পক্ষে অসম্ভব, চোখ জুড়ানো মনোহর সামগ্রী থেকে আরো কিছু কিনতেই হবে, আধুনিক বিশ্বে ডাকঘর বাঁচানোর এই তরিকা আমাদেরও চালু করতে হবে, শুনেছি ঢাকায় কোথাও কোথাও নাকি তা করা হয়েছে, জনবহুল দেশে সব জায়গাতে সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে এর সম্প্রসারিত রূপই সমাধান। মোবাইলের মত জটিল যন্ত্র যদি টেকনাফ থেকে পঞ্চগড় ছড়িয়ে পড়তে পারে, স্কাইপ যদি তেঁতুলিয়ার চাষীর বাহন হয়, ডাকঘরের আধুনিকায়ন ও গ্রাম-বাংলা হজম করতে পারবে। আমাদের অতীত ও বর্তমানে যোগসূত্র ডাকঘরগুলো হূদয় জুড়ে আছে, থাকারই কথা। রবীন্দ্রনাথের আমল, বিভূতিভূষণের উধাও ডাকঘরের উদাস দুপুরবেলা, সুকান্তর রানার বা পূর্ববঙ্গের ডাকপিওন আমাদের ঐতিহ্য। এখন এর সাথে যুক্ত আছেন অজস্র মেধাবী মানুষ, এই প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থার স্তরে স্তরে শ্রম ও মেধা দিয়ে আগলে রাখা মানুষরা আমাদেরই আত্মীয়, আত্মীয় ডাকঘর, ডাক ব্যবস্থাও, একে আবার চাঙ্গা করে তুলতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি চাই যোগ্য নেতৃত্ব, সততা আর আধুনিকায়ন, কারণ এ অবিনাশী ও চিরন্তন। [সিডনি থেকে]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন