রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অব্যাহত পানি সংকট চলছে। সংকট নিরসনে ঢাকা ওয়াসার হস্তক্ষেপ কামনা করেও কোন সুফল পাচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে পুরান ঢাকায় এই সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এই এলাকায় পানি সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে দুর্গন্ধ। পোস্তগোলা ও শ্যামপুর এলাকায় পানির দাবিতে শনিবার এলাকাবাসী বিক্ষোভ করেছে।
সরজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পানির সাথে যোগ হয়েছে দুর্গন্ধ। ময়লা ও ফেনাযুক্ত ঘন কালো, ঘোলাটে পানির সাথে কেঁচোসহ নানা পোকা মাকড় যুক্ত হচ্ছে। একদিকে সংকট তার উপর দুর্গন্ধযুক্ত পানি নগর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। দীর্ঘ চেষ্টার পরও কোন কোন এলাকায় এক বালতি পানি মিলছে না। পানির জন্য হাহাকার উঠেছে নগরীতে। কিন্তু পানি সংকটের কোন সুরাহা হয়নি। পুরান ঢাকা ছাপিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে গুলশান-১ ও ২, মহাখালী, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, গাবতলী, তেজগাঁ, তেজতুরিবাজার, তেজকুনিপাড়া, কাওরানবাজার, বারিধারা, বসুন্ধরা, মিরপুর, শ্যাওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, পল্লবী, আদাবর, লালবাগ, বাড্ডা, নর্দ্দা, জগন্নাথপুর, কালাচাঁদপুর, জোয়ার সাহারা, মুগদা, মান্ডা, পোস্তগোলা ও শ্যামপুর এলাকায়।
অভিজাত এলাকা হিসাবে পরিচিত গুলশান এভিনিউ এলাকার বেশ কিছু সড়কে গত এক মাস ধরে ওয়াসার পানি সরবরাহ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পানি সংকটের কারণে অনেক দেশি, বিদেশি নাগরিক এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। টাকা দিয়েও ওয়াসার পানি সংগ্রহ করতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা। সাতদিন আগে সিরিয়াল দিয়েও ওয়াসার পানির গাড়ি পাচ্ছেন না অনেক এলাকার মানুষ।
অবশ্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছেন, পানি সংকট নিরসনে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। গত দুইদিন ধরে মহাখালী থেকে আনা পাঁচটি গাড়িযোগে রাত-দিন পানি সরবরাহের কাজ চলছে। পানি সংকট সম্পর্কে গুলশান এভিনিউ এলাকার ১২৬ নম্বর রোডের বাসিন্দা ব্যারিস্টার লুত্ফর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, গত এক মাস ধরে গুলশান এভিনিউ এর ৯৫, ৯৮, ৯৯, ১২৫, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১২৯, ১৩০ সহ আশপাশের দশ থেকে ১৫টি সড়কে পানি সংকট চলছে। টাকা দিয়েও ওয়াসার পানি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ভিআইপিদের পানি যোগান দিতেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তারা সাধারণের প্রতি নজর দেয়ার সুযোগই পাচ্ছেন না। বাইরে থেকে কেনা পানি দিয়ে কোন মত জীবন ধারণের চেষ্টা করছেন অধিকাংশ পরিবার।
গুলাশান-১ এলাকার অধিবাসী পিডিপির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, এখন বিনামূল্যে পানি সরবরাহ করা দরকার। কিন্তু কোথাও কোথাও পানির দাম বেশি নেয়া হচ্ছে। গুলশান-১ এর ২৭ নম্বর সড়কের বাসিন্দা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, চরম পানি সংকটে ভুগছি। ওয়াসা কার্যালয়ে দফায় দফায় লোক পাঠিয়েও কাজ হচ্ছে না। ওয়াসার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এ সুযোগে ওয়াসার এক শ্রেণির কর্মচারী নাগরিকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
শ্যামলী পিসি কালচার হাউজিংয়ের এক বাসিন্দা বলেন, গত এক মাস ধরে এই হাউজিংয়ে পানি সংকট চলছে। অব্যাহত পানি সংকটের কারণে পিসি কালচারের ১৪টি হোল্ডিংয়ের বাসিন্দারা বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ঢাকা ওয়াসার কাছে অভিযোগ করলেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
পানি নিয়ে ক্রমেই পুরান ঢাকাবাসীর দুর্ভোগ- দুর্গতি বাড়ছে। পুরান ঢাকার ওয়ারি, শশীমোহন বসাক লেন, বনগ্রাম ও মৈশুন্ডি এলাকায় গত এক মাস যাবত্ পানি সংকট লেগে আছে। দিন-রাত চেষ্টার পর যতটুকু পানি সংগ্রহ করা হচ্ছে তাতেও দুর্গন্ধ। ফেনাযুক্ত কালচে পানি সাংসারিক কোন কাজে আসছে না।
উত্তর মৈশুন্ডির এক গৃহবধূ বলেন, ভোর রাত থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কিছুটা পানি ওয়াসার লাইনে আসলেও তাতে তীব্র দুর্গন্ধ। কালচে দুর্গন্ধযুক্ত পানি মুখে দেয়া যাচ্ছে না। ফুটানোর পর পানির পাত্রের তলায় কালো কাদার ন্যায় গাদ জমা হচ্ছে। বিশুদ্ধ না হওয়ায় পানি পান করা সম্ভব হচ্ছে না। একই এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, ময়লাযুক্ত দুর্গন্ধময় পানি দিয়ে থালা বাসন মাজা এমনকি কাপড়-চোপড় ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ওয়াসার পানিতে গোসল করায় বাচ্চাদের খোস-পাঁচড়াসহ নানা চর্মরোগ দেখা দিয়েছে।
একইভাবে পানি সংকট ও পানিতে দুর্গন্ধ দেখা দিয়েছে সূত্রাপুর, সদরঘাট, ইসলামপুর, বংশাল, জয়কালী মন্দির, মিটফোর্ড, জুরাইন, শ্যামপুর, ধোলাইখাল, দোলাইরপাড়, পোস্তগোলা, টিপু সুলতান রোড, কুলুটোলা, ওয়ারী, বনগ্রাম রোড, অভয়দাস লেন, জিয়া মাঠ ও মুরাদ সড়ক এলাকা, ঠাটারী বাজার, চক বাজার, মগবাজার, শাঁখারীবাজার, ফরিদাবাদ, আর্শিনগেট, আলমগঞ্জ লেন, গোপীবাগ, দীননাথসেন লেন, আইজিগেট, ঢালকানগর লেন, গেন্ডারিয়া, নয়া বাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়।
ভুক্তভোগীরা জানান, দুর্গন্ধযুক্ত পানি ব্যবহারের ফলে পেটের পীড়াসহ শরীরে ছোট ছোট দানার সৃষ্টি হচ্ছে। পরবর্তীতে এসব দানা থেকে খোস-পাঁচড়ার সৃষ্টি হচ্ছে।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পানি সংকট ও সরবরাহকৃত পানিতে দুর্গন্ধের খবর ওয়াসার সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানালেও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
এদিকে পোস্তগোলা ও শ্যামপুর ইউনিয়নে পানির সংকট তীব্রতর হয়ে উঠেছে। পোস্তগোলা পানির পাম্পটি গত এক মাস যাবত্ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এখানে কয়েক হাজার পরিবার পানি কষ্টে ভুগছেন। সেখানে ৪ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা ঠিকমত পানি পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
গতকাল এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে শত শত নারী পুরুষ রাস্তায় নেমে আসে। তারা পোস্তগোলা-শ্যামপুর রাস্তায় সকাল ৯টা থেকে ১০টা এক ঘন্টা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় রাস্তায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের আশ্বাসের ভিত্তিতে বিক্ষুব্ধরা অবরোধ তুলে নেয়।
এ ব্যাপারে শ্যামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইজুল ইসলাম বলেন, পানির জন্য এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। আমি ওয়াসা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি ইতিমধ্যে অন্য একটি লাইন থেকে সংযোগের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে নির্দেশ দিয়েছেন। শিগ্রই অকেজো পানির পাম্পটি সচল করবেন বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম-এ-খান ইত্তেফাককে বলেন, পুরান ঢাকার কিছু কিছু স্থানে ওয়াসার লাইনে লিকেজ থাকায় তা দিয়ে কোন কোন সময় ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করে পানিতে দুর্গন্ধের সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ওয়াসার কর্মীরা ছুটে যাচ্ছেন ঘটনাস্থলে। তিনি বলেন, রাজধানীবাসীর পানি সংকট নিরসনকল্পে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পুরান পানির লাইন সংস্কারসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পানির দুর্গন্ধ দূর করতেও একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। শিগ্রই এই সংকট দূর হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
