শ্রাবণের ৩০ তারিখ কলকাতার কালীঘাটে ৪২ নম্বর মহিম হালদার রোডের মামার বাড়ির ছোট্ট একটি ঘরে ছোট্ট একটি শিশুর জন্ম। সালটি ছিলো বাংলা ১৩৩৩ (১৯২৬ ইং)। এই শিশুটির জীবন পরিক্রমাও খুব ছোট্ট। পুরো একুশটি বছরও পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-মাধুর্য উপভোগের সুযোগ হয়নি। বাবা নিবারণ ভট্টাচার্য। মা সুনীতি দেবী। তাঁদের দ্বিতীয় পুত্রটি সুকান্ত ভট্টাচার্য সেদিন পৃথিবীতে এসেছিলেন। তাঁর পিতার বাড়ি ছিলো বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া গ্রামে।
শিশু সুকান্ত মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। সাদামাটা দিনযাপন। রোগাটে সুকান্ত প্রায়শ ম্যালেরিয়ায় ভুগতেন। কিন্তু মানসিকভাবে ছেলেটি অত্যন্ত সহজ-সরল, সত্যভাষী, পরদুঃখকাতর। লেখাপড়াতেও ছিলেন মেধাবী। লাজুক প্রকৃতির ছেলেটির চোখে-মুখে ছিলো বুদ্ধির দীপ্তি। লেখালেখির প্রতিও ছিলো প্রবল ঝোঁক। গোপনে গোপনে বাঁধানো খাতার পাতা ভরে যেতো কবিতা আর গল্পে। শুধু কী তাই? মাত্র ছয় বছর বয়সেই নিজ উদ্যোগে হাতেই লিখে ফেললেন একটি পত্রিকা। যার নাম “সঞ্চয়”। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রেরণায় “সপ্তমিকা” নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা সম্পাদনা করে ফেলেন। এমনি করে পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে নিজের মধ্যেই তৈরি হয় এক সাহিত্যজগত্। লিখতে থাকেন একের পর এক ছড়া, কবিতা, গল্প, গান ইত্যাদি। ‘রাখাল ছেলে’ গল্পের রাখাল যেনো সুকান্ত নিজেই। ‘সুচিকিত্সা’ ছড়ায় সুকান্তের রসিক মনের পরিচয় মেলে। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে কিশোরদের জন্য একটি বিভাগ থাকে। সেখানে ছোটদের জন্য লেখা ও খবর থাকতো। সে সময় ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক সংঘের মুখপাত্র ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকায় কিশোরদের উদ্দেশ্যে বলা হলো- ‘তোমরাও দল গড়ো’। ‘কিশোর বাহিনী’ গড়ে উঠলো। এর পরিচালক হলেন কবি সুকান্ত। তিনি কিশোরদের শরীর-স্বাস্থ্য, লেখাপড়া, দেশপ্রেম, জনহিতকর কাজ, খেলাধূলা- এককথায় ‘সুসন্তান’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন।
সুকান্ত যখন একেবারেই ছোট, তখন বিশ্বরাজনীতি ভয়ানক রকম উত্তপ্ত। উত্তাল সেই দিন গুলিতে একদিকে বিদ্রোহী কবির প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া, বিবেকানন্দের সংগ্রামী-বার্তা, গান্ধীজী কারাগারে, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু। মেহনতী মানুষের সাম্যবাদী চেতনার ঢেউ সোভিয়েত থেকে ভারত পর্যন্ত্ম আছড়ে পড়লো। হিটলারের ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদীর আগ্রাসন, সব মিলিয়ে মানবজীবন ভীষণভাবে বিপর্যস্ত। ততদিনে শিশু সুকান্ত বেশ বড় হয়েছে। চারপাশের দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে আর্ত মানবতার কান্না তাঁকে ‘জনতার কবি’ করে তুললো। তিনি বললেন- ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।’
নয়/দশ বছর বয়সেই একের পর এক মমতার আশ্রয়গুলো হারিয়ে যেতে থাকলো, দিদির মৃত্যু, মায়ের মৃত্যু, খুব আপনজন এক দাদার মৃত্যু তাঁকে আরো বেশি করে জীবন ও জগতের প্রতি ভাবিয়ে তুললো। অন্তর্মুখী কিশোর সুকান্ত এবার সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন। ‘আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি’- বলে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমা-চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটি’- এই উচ্চারণে কবি সুকান্তের অন্তর্বেদনার সাথে সাথে নির্জলা সত্যভাষণ তাঁকে করেছে কালজয়ী। মাত্র একুশ বছর বয়সের এই যুবকের মধ্যে ছিলো বিপ্লবী মেজাজ, বিদ্রোহী সুর, গণ-মানুষের জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার এবং আশাবাদ। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী সুকান্ত বলেছেন-
আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবোই। (বোধন)
আরেকটি কবিতায় বলেছেন,
বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষু করো চিত্ত
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত। (উদ্যোগ)
ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে ‘আকাল’ (১৩৫১) নামক কাব্যগ্রন্থের সম্পাদকও ছিলেন তিনি। সুকান্তের জীবদ্দশায় তাঁর কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর একে একে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’ (১৩৫৪), ‘ঘুম নেই’ (১৩৫৭), ‘পূর্বাভাস’ (১৩৫৭)। ছড়ার বই ‘মিঠে কড়া’ (১৩৫৮), দু’টি নাটিকা সংকলন ‘অভিযান’, ‘হরতাল’ গল্পের বই, ‘গীতিগুচ্ছ’ গানের বই ইত্যাদি।
অমিত প্রতিভার অধিকারী সুকান্ত্ম ভট্টাচার্য মাত্র একুশ বছর বয়সের রচনা দিয়েই একটি যুগকে ধারণ করেছেন। সেই সময়ের প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিকদের সাথে নিজের একটি গৌরবমন্ডিত আসন জয় করে অমর হয়ে রইলেন বাংলা সাহিত্যে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার গভীরতা, ব্যপ্তি, তীব্রতা, ব্যঞ্জনা অত্যন্ত সাদামাটা ভাব ও ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। নিজের জীবনের মতোই তাঁর রচনা গুলোও সহজ সরল কিন্তু গভীর তাত্পর্যপূর্ণ। মানিক বন্দোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন, “সে খর্বদেহ,
নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত উত্তলিত, উদ্ভাসিত কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।”
বাংলার এই বিক্ষুব্ধ কবির সংগ্রামী উচ্চারণগুলো ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির মনে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। যাদবপুরের যক্ষা হাসপাতালে ১৩৫৪ সালের ২৯ বৈশাখ এই তরুণ কবির অকালপ্রয়াণ ঘটে।
